মঙ্গলবার গণ-আন্দোলনের মুখে পড়ে পদত্যাগ করেছিলেন নেপালের প্র্ধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। এরপর থেকে তিনি কোথায় আছেন, কি অবস্থায় আছেন, তা নিয়ে চলছিল বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। অবশেষে জানা গেল তিনি কাটমাণ্ডুর কাছেই নেপালি সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় শিবপুরী ব্যারাকে আছেন। সেই সঙ্গে নেপালের জেন-জে নেতৃত্বাধীন সহিংস বিক্ষোভের মধ্যে পদত্যাগের পর প্রথমবারের মতো সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও সামনে এল এবার। সেখানে তাঁর ক্ষমতা হারানোর জন্য ভারতকেই দায়ী করেছেন। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, দলের সাধারণ সম্পাদককে লেখা এক চিঠিতে ভারতের তীব্র সমালোচনা করেছেন নেপালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি।
নেপালে মাত্র ৩৬ ঘণ্টার সহিংস আন্দোলনের জেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী ওলি এবং তাঁর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য। এরপর থেকেই নেপালের দিকে গোটা বিশ্বের নজর ঘুরে যায়। মাত্র এক বছর আগেই ভারতের পড়শি দেশ বাংলাদেশে একই কায়দায় এক গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, তাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, অনেকটা বাংলাদেশের কায়দায় নেপালেও সরকার বদল ঘটিয়ে দেওয়া হল। দুই দেশের সরকারবিরোধী আন্দোলেনের মধ্যে প্রচুর মিল রয়েছে। তাই কেউ কেউ এই ঘটনার পিছনে বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে বলে দাবি করছেন। এমনকি আন্দোলনকারী জেন-জি প্রজন্মের যুবরাও দাবি করেছেন, তাঁদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ছাইতাই করেছে কোনও বহিরাগত শক্তি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কে বা কারা শান্ত দেশ নেপালে অশান্তির আগুণ জ্বালাল?
যখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত বিশ্বের তামাম বিশ্লেষকরা, তখনও সামনে এল কেপি শর্মা ওলির বিস্ফোরক দাবি। অজ্ঞাতবাসে থাকাকালীন নিজেরই দলের সম্পাদককে লেখা এক চিঠিতে নেপালের সদ্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দাবি, “আমি ক্ষমতা হারিয়েছি কারণ আমি অযোধ্যায় ভগবান রামের জন্মের বিরোধিতা করেছিলাম”। পাশাপাশি তাঁর আরও দাবি, ভারতের সাথে বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চল, লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা নিয়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ক্ষমতাচ্যুতির পিছনে অবদান রেখেছে। ওই চিঠিতে ওলি আরও লিখেছেন, স্বভাবগতভাবেই আমি একটু জেদী। সেই জেদ না থাকলে হয়তো অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিতাম। একই জেদের কারণেই আমি সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলিকে স্থানীয়ভাবে নিবন্ধনের দাবি করেছিলাম। আমি জোর দিয়েছিলাম যে লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা নেপালের। আমি দৃঢ়ভাবে বলেছিলাম যে ভগবান শ্রী রাম ভারতে নয়, নেপালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যদি আমি এই অবস্থানগুলির সাথে আপস করতাম, তাহলে আমি অনেক সহজ পথ বেছে নিতে পারতাম এবং অনেক সুবিধা পেতে পারতাম”।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মত, কেপি শর্মা ওলি খোলাখুলিভাবে চিনপন্থী। তাঁর বহু সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল নয়া দিল্লি। বিশেষ করে অযোধ্যার রাম মন্দির নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য, লিপুলেখ পাস নিয়ে চিনের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর ভারতের বিরোধিতা করা নিয়ে ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গে মতোবিরোধ তৈরি হয়েছিল কাটমাণ্ডুর। এখন ক্ষমতা হারিয়ে তাই ভারতকেই কাঠগড়ায় তুলছেন কেপি শর্মা ওলি। প্রসঙ্গত, লিপুলেখ পাস হল ভারত ও নেপালের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত সীমান্ত সমস্যা। একটি ভূখণ্ড, যার দাবি করে ভারত ও নেপাল উভয়েই। কালাপানি অঞ্চলে অবস্থিত এই লিপুলেখ। আবার কালি নদীর উৎস নিয়ে নেপাল দাবি করে নদীটি লিপুলেখের উত্তর-পশ্চিমে লিম্পিয়াধুরা থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের দাবি, কালি নদী কালাপানি গ্রামের কাছে উৎপন্ন। ফলে বিতর্কিত অঞ্চলটি ভারতীয় মূল ভূ-খণ্ডের উত্তরাখণ্ডের অংশ। নেপালের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়গুলিকেই সামনে এনে ভারতের বিরুদ্ধে দোষারোপ করছেন।
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ দাবি করছেন, কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বে নেপালের ক্ষমতাসীন দল পুরোপুরি চিনের হয়ে কাজ করছিল। বেজিংয়ের কথামতো ভারতের সঙ্গে মতোবিরোধ সৃষ্টি করছিল। বিশেষ করে রাম, সীতা ও হনুমান প্রসঙ্গে তিনি একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, যা ভারতের হিন্দু ভাবাবেগে আঘাত হেনেছিল। এরপরই নেপাল সরকার ৪ সেপ্টেম্বর সে দেশে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টগ্রাম, এক্স-হ্যান্ডেল সহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদে গর্জে ওঠে দেশের যুব সম্প্রদায় বা জেন জে প্রজন্ম। ৮ সেপ্টেম্বর নেপাল সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে নেপালের জেন-জি সম্প্রদায়। রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভে জ্বলে ওঠে নেপাল। এরপর নেপালি সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন কেপি শর্মা ওলি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই চর্চা চলছে, ভারত যদি নেপালের সরকার পতনের পিছনে থাকে, তাহলে ভারতের পরবর্তী টার্গেট হবে বাংলাদেশ থেকে মুহাম্মদ ইউনূসকে উৎখাত করা।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post