ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ বেশ কয়েকদিন ধরেই দাবি করছেন, ভারতীয় সেনা শিলিগুড়ি করিডর লাগোয়া বাংলাদেশের ৬০-৬২ কিমি এলাকা দখল করে নিয়েছে। ওই এলাকায় থাকা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি’র পোস্ট গুলি দখল করেছে, ফলে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। বেশ কয়েকদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল এই নিয়ে। তবে ভারত বা বাংলাদেশ, কোনও তরফেই এর সত্যতা বা সঠিক কোনও অবস্থান বলা হয়নি। ফলে এই বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিলো নানা মহলে। অবশেষে মুখ খুলল বিজিবি। এক বিবৃতিতে বিজিবি জানিয়েছে “অতি সম্প্রতি একটি স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘লালমনিরহাটে ভারতের ৬২ কিলোমিটার দখল?’ শিরোনামে একটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মনগড়া ও রাষ্ট্রবিরোধী গুজব প্রচার করছে”। অর্থাৎ বাংলাদেশ এবার সরকারিভাবে এই খবরকে মিথ্যা ও গুজব বলল। যদিও ভারতের তরফে এখনও কিছু বলা হয়নি এই বিষয়ে।
বিবৃতি দিয়ে বিজিবি এ ধরনের অপপ্রচারের নিন্দা করলেও কয়েকটি বিষয়ে জল্পনা থামছে না। যেমন ভারত কেন আচমকা শিলিগুড়ি করিডরকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিল, কেন শিলিগুড়ি করিডরের আশেপাশে তিনটি নতুন সেনাচাউনি চালু করে দিল। কেনই বা বাংলাদেশকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ ও গোটা উত্তর পূর্ব ভারত জুড়ে বড়সড় সামরিক মহড়া দিতে চলেছে? আবার উল্টোদিকে বাংলাদেশও লালমনিরহাটে পরিত্যাক্ত বিমানঘাঁটি নতুন করে চালু করতে উদ্যোগী হল, বা সেখানে নতুন করে রেডার সিস্টেম বসালো?
ভারতের পশ্চিম প্রান্তে পাকিস্তান সীমান্ত ও আরব সাগরে চলছে বৃহত্তর সামরিক মহড়া। অপারেশন ত্রিশূল নামে ওই যুদ্ধ মহড়ায় যৌথভাবে অংশ নিচ্ছে ভারতের তিন সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য এজেন্সিগুলি। বড়সড় ওই যুদ্ধমহড়ার জন্য বিশাল এলাকাজুড়ে নোটাম জারি করা হয়েছে। পাকিস্তানও নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে অপারেশন ত্রিশূলের কারণে। কিন্তু ভারত আচমকা কেন পূর্ব প্রান্ত অর্থাৎ বাংলাদেশকে ঘিরে সামরিক মহড়া শুরু করলো? ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ড এই যৌথ মহড়া পরিচালনা করছে, এর জন্যও দীর্ঘকালীন নোটাম জারি করা হয়েছে উত্তরপূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরের একটা বড় অংশজুড়ে। বলা হচ্ছে, ভারতীয় সেনার তিন বাহিনী অপারেশন ত্রিশূলের থেকেও বড় আকারে এই যুদ্ধ মহড়া করবে। পশ্চিমবঙ্গের দুটি, অসম ও অরুণাচল প্রদেশের বিমানঘাঁটিগুলিতে ইতিমধ্যেই ৭৫টি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। এরমধ্যে রাফাল, এসইউ-৩০ এমকেআই রয়েছে। হিমালয়ের উচ্চ অংশে বিশেষ ড্রোন মহড়া চলছে। কিন্তু যে খবরটি সামনে আসছে সেটা আরও মারাত্মক। শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেক এলাকা সুরক্ষিত করতে মোতায়েন করা হয়েছে ভৈরব বাহিনী, প্যারাট্রপার বাহিনীর মতো ইন্ডিয়ান আর্মির সবচেয়ে ঘাতক বাহিনীগুলি। যা বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য বা অভিযান ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, এই মহড়াতে নৌবাহিনীর অংশগ্রহণ। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, তিস্তাপাড়ে যেমন ভারতীয় সেনার জমজমাট মহড়া চলবে, তেমনই বঙ্গোপসাগরেও ভারতীয় নৌসেনার তৎপরতা থাকবে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, নৌসেনাকে এই মহড়ায় সামিল করার অর্থই হল বড় কোনও পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত সরকার। পাশাপাশি অসমের ধুবড়ি, পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া ও বিহারের কিসেনগঞ্জে যে নতুন তিনটি সেনা চাউনি চালু করা হল, সেখানেও বিপুল সংখ্যায় বাহিনী মোতায়েন ও নানা যুদ্ধস্ত্র মজুত করা হয়েছে নিঃসন্দেহে। আচমকা বাংলাদেশকে ঘিরে এত বড় তৎপরতা কেন, সেটা নিয়েই চলছে আলাপ-আলোচনা।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা নদীর দুই পাড়েই বড় মাপের সৈন্য তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশের দিকে লালমনিরহাটে যেমন রেডার সিস্টেম ও যুদ্ধবিমান রাখার বন্দোবস্ত করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাশাপাশি বাংলাদেশ চিন ও পাকিস্তান থেকে ফাইটার জেট এবং তুর্কি থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার তোড়জোড় করছে। তাই ভারত পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশকে ঘিরে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে নয়া দিল্লির কয়েকটি সূত্র অনুযায়ী, ভারত এবার চিকেন নেক নিয়ে স্থায়ী কোনও সমাধানের ব্যবস্থা করছে। অর্থাৎ, যা রটে কিছু তো বটে। ভারত ইতিমধ্যেই শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেকের পরিধি বৃদ্ধি করতে শুরু করে দিয়েছে। কারণ অতি সংকীর্ণ ওই অঞ্চলকে টার্গেট করে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর দোসররা বেশ কয়েকবার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি বাংলাদেশের লালমনিরহাট ও রংপুর এলাকায় পাকিস্তানী সেনা কর্তা এবং আইএসআই এজেন্টদের গতিবিধি বেড়েছে। তাই ভারত শুধু শুধু প্রস্তুতি নিচ্ছে না। বড় কোনও পদক্ষেপও নিতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল












Discussion about this post