ঘর মে ঘুস কে মারেঙ্গে”, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক জনসভায় এরকমই দাবি করেছিলেন একসময়। আমরা এর আগে উড়ি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক আর বালাকোট হেয়ার স্ট্রাইক দেখেছিলাম। সেবারও পাকিস্তানের সীমানা অতিক্রম করে মেরে এসেছিল ভারতীয় সেনা। কিন্তু এবার সত্যি সত্যিই যেন ঘরের ভিতরে ঢুকেই মেরে এল ভারতীয় সেনা। পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রীতিমতো হুমকির সুরে বলেছিলেন, এবার প্রত্যাঘাত হবে কল্পনাতীত। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, পহেলগাঁও হামলায় জড়িত জঙ্গিরা এবং তাঁদের পিছনে থাকা মাস্টার মাইন্ডরা সমচিত জবাব পাবে। গত ২২ এপ্রিল পহেলগাঁও হত্যার ঠিক ১৫ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মাটিতে ঢুকে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে ভারতীয় সেনা যোগ্য জবাব দিয়ে এল। যার পোশাকি নাম অপারেশন সিঁদুর। মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ৯টি স্থানে মোট ২১টি হামলা করেছে ভারতীয় বায়ু সেনা ও সেনাবাহিনী। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একাধিক জঙ্গিঘাঁটি। তাতে যেমন জৈশ-ই-মহম্মদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন ছিল, তেমনই লস্কর-ই-তৈবার সদরঘাঁটিও ছিল। ঘটনার ৪৮ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও, কোনও জবাব আসেনি পাকিস্তান থেকে। অর্থাৎ পাকিস্তান কোনও জবাব দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন তার আগে তিনি ছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। ২০০৮ সালে ভারতবর্ষের বুকে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা হিসেবে চিহ্নিত মুম্বাই অ্যাটাক হয়েছিল। যা ২৬১১ হামলা হিসাবে গোটা বিশ্বজুড়েই কুখ্যাত। এই ঘটনাতেও পাকিস্তানি মদতপুস্ট জঙ্গিরা যুক্ত ছিল। সেই ঘটনায় ১৬৪ জন নিহত ও কমপক্ষে ৩০৮ জন আহত হন। যা সারা বিশ্বে এই ঘটনা তীব্রভাবে নিন্দিত হয়। সেবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেসের মনমোহন সিং। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেভাবে কোনও পদক্ষেপ দেননি। এমনকি এক পাকিস্তানি জঙ্গি আজমল কাসব জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ে গেলেও ভারত সেভাবে কোন পদক্ষেপ নেয়নি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আলাদা ধাতু দিয়ে তৈরি। তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি যদি প্রধানমন্ত্রী হতাম তাহলে শত্রুর দেশে ঢুকে হামলা করে আসতাম।
উল্লেখ্য তখনও নরেন্দ্র মোদী জানতেন না যে তিনি একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন। আরও বেশ কয়েক বছর পর তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। তারপর আমরা দেখেছি তিনি কথা রেখেছেন। উড়ির ঘটনার পর আর পুলওয়ামা হামলার পর, ভারতীয় সেনা পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ভিতরে ঢুকে বড়সড় হামলা চালিয়ে ফিরে এসেছিল। যা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও এয়ার স্ট্রাইক ছিল ভারতীয় সেনার। কিন্তু সেটা ছিল গোপন অভিযান। তবে এবার ঘটনাটা ঠিক আলাদা।
কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈশরণ ভ্যালিতে গত ২২ এপ্রিল এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়। এবারই প্রথম দেখা গেল, বেছে বেছে হিন্দু পুরুষদের আলাদা করে মারা হল। মৃতের সংখ্যা ২৭ জন। এই ঘটনার পর গোটা দেশ জুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। ঘটনার পিছনে যে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি দায়ী সেটা বোঝা গিয়েছিল। পরে প্রমানও মেলে। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-সহ ভারতের অন্যান্য মন্ত্রীরা হুমকি সুরেই জানায়, এবার বড়সড় হামলা হতে চলেছে পাকিস্তানে। আর হামলা হবে কল্পনাতীত। ঘটনার ১৫ দিন পর, সেটা ঘটতে দেখলাম আমরা।
নরেন্দ্র মোদি, যিনি গুজরাটের প্রধানমন্ত্রী থাকুন না কেন বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তাঁর চিন্তা-ভাবনা একই। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি যেভাবে সিমি-র নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনিই নকশাল বা মাওবাদীদের সমূলে উৎপাটন করার সংকল্প নিয়েছেন। আর হচ্ছেও তাই। এবার তিনি ঠিক করেছেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলিকে শিকড় থেকে বিনিষ্ট করবেন। সেটা পাকিস্তানেই হোক বা বিশ্বের অন্য কোনও দেশে। বর্তমানে তিনি ভারতবর্ষকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিধর দেশে পরিণত করেছেন। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হোক বা ইউরোপীয় দেশগুলি। চিন হোক বা পাকিস্তান, নরেন্দ্র মোদি যেটা বলেন, সেটাই করে দেখান। পহেলগাঁও হামলার পর যিনি বলেছিলেন, সন্ত্রাসবাদীদের সাজা দেবেন, পাকিস্তানের মাটিতে ঢুকে সেটাই করে দেখিয়েছেন। তবে এখনও অনেকটা বাকি রয়েছে। তাই অপারেশন সিঁদূর, এখনও শেষ হয়নি, আরও কয়েকটা হামলার ঘটনা ঘটবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।












Discussion about this post