বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পরেই দেশজুড়ে এনসিপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতেই এনসিপির অন্যতম নেতা তথা প্রার্থী সারজিস আলম ফেসবুক পোস্টে বিএনপি ও তারেক রহমানকে কার্যত এই হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের ফল বেরোতেই দেখা যায় সারজিস বিপুল ভোটে হেরেছেন। যদিও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জিতেছেন। ভোটের ফল ঘোষণার পর ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর বাড্ডায় নাহিদ ইসলামের বাড়িতে সাক্ষাৎ করতে যান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেখা যায় সেখানে প্রবেশের সময় দেখা যায়, নাহিদ ও সারজিস আলমকে বুকে টেনে নেন তারেক রহমান। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই তারেক রহমান এই সাক্ষাৎ করেছেন বলে দাবি করেছিল বিএনপি নেতৃত্ব। কিন্তু যত সময় গিয়েছে এই সৌজন্যের রাজনীতি আর দেখা যাচ্ছে না। কার্যত এনসিপি নেতা তথা ছাত্রনেতাদের দৌঁড় করাচ্ছে বিএনপি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা যখন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপি গঠন করেছিল, তখন তাঁদের স্বপ্ন ছিল বিশাল। তাঁদের মধ্যে অনেকে কার্যত ধরেই নিয়েছিলেন তাঁরাই ক্ষমতায় চলে আসবেন। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেরেছিল এনসিপি। যদিও ভোটের আগে তাঁরা ঘটা করে সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছিল এক হাজারের বেশি মনোনয়ন ফর্ম বিক্রি হয়ে গিয়েছে তাঁদের। কিন্তু দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ডা. তাসনিম জারা-সহ অধিকাংশ নেতৃত্বই এনসিপি ছাড়েন ভোটের আগে। ফলে কার্যত জাতীয় নাগরিক পার্টি ভেঙে চুরচুর হয়ে যায় ভোটের আগে। দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা-নেত্রী দল ছাড়েন। তাঁদের মূল অভিযোগ ছিল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি গাঁটছড়া বাধার সিদ্ধান্ত। এনসিপির যারা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে গিয়েছিলেন, তাঁরাই থেকে যান দলে, আর বাকিরা দল ছাড়েন। শেষ পর্যন্ত এনসিপি মাত্র ৩০টি আসন পায় ভোটে লড়ার জন্য। আর এই ৩০টি আসনে লড়ে মাত্র ৬টি আসনে জয়লাভ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি। সবমিলিয়ে যেটা বোঝা গেল, সেটা হল এনসিপি স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে কার্যত বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়েছে। তবে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা হল, তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এনসিপি কার্যত মুখ লুকিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ তাঁদের ময়দানে দেখাই যাচ্ছে না। দিন কয়েক আগেই ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁয় এনসিপির সাধারণ সভা হয়। সভায় নির্বাচন–পরবর্তী এই পর্যালোচনা করেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। সেখানে আলোচনায় উঠে এসেছে, এবারই প্রথম সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে এনসিপির। সেই হিসেবে এই ফল যথেষ্ট ভালো। ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পেরেছে তাঁরা। ওই দিনের সাধারণ সভায় এনসিপির পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়। সেখানে বেশিরভাগ নেতার পর্যবেক্ষণ ছিল, এবার সংগঠনকে আরও মজবুত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যারা কার্যত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছে, তাঁদেরই মদতে এগিয়ে গিয়েছে এবং পরবর্তী সময় নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তাঁরা নিজস্ব সংগঠন গড়ে তোলার দিকে নজর দেয়নি। তাই বাংলাদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে জামায়াত জিতলেও মুখ থুবড়ে পড়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপি। ভোটের মুখেও যখন তাঁদের জনভিত্তি তৈরি হয়নি, তখনই তাঁরা জামায়াতের ছাতার তলায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। আর এই সিদ্ধান্তই তাঁদের দলে ভাঙনের মূল কারণ।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একটি পোস্ট দেন। তাতে তিনি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক অ্যাকাউন্টকে ট্যাগ করে লেখেন, “হাসনাত কই, লীগ তো দোকান খোলা শুরু করছে। নির্বাচন তো হইল, এইবার সংস্কার আর বিচার হইব্বে”। অর্থাৎ, হাসনাতের মতো এনসিপি নেতারাও এখন সাংসদ হয়ে আর খুব একটা আন্দোলের রাস্তায় যাচ্ছেন না। সারজিস, পাটওয়ারির মতো যারা হেরেছেন তাঁরাই এখন এনসিপির ধারক ও বাহক।












Discussion about this post