সীমান্ত শান্ত থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল ইউনূস সরকার। একসময় মনে হয়েছিল, তিনি তাঁর আশ্বাস পালন করতে সক্ষম হবেন। বিজিবিকে অতিরিক্ত অস্থির হতে হবে না। এখন অনেকের মনে হচ্ছে, ইউনূস সরকারের ওই আশ্বাসও ছিল ফাঁকা আওয়াজ। যে মানুষ দেশ শাসন করতে চূড়ান্ত ব্যর্থ, তাঁর শাসনামলে সীমান্ত কি করে শান্ত থাকবে!
মায়ানমারে চলছে গৃহযুদ্ধ। যার প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে। এই মুহূর্তে সব থেকে অনিরাপদ সীমান্ত হল বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্ত। সীমান্ত বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র টেকনাফ স্থলবন্দর গত নয় মাস ধরে কার্যত অচল। নাফ নদের মায়ানমার অংশে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দাপট রয়েছে। এ কারণে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা হারাচ্ছে সরকার। বন্দরের সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিন কোটি টাকা। কর্মহীন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে তদারকি সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে। বলা হচ্ছে, এই আরাকান আর্মিকে কোলে তুলে নিজের হাতে দুধ আর কলা খাইয়েছিলেন খলিলুর। এখন তার মাশুল ওই সীমান্তে থাকা বাংলাদেশিদের ভোগ করতে হচ্ছে।
মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত সীমান্ত এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে নাফ নদের মিয়ানমার অংশে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে গোষ্ঠীটি। কমিশন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে আরাকান আর্মির বাধার মুখে মিয়ানমারের জান্তা সরকার সীমান্ত বাণিজ্য কার্যত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন শতাধিক আমদানি-রপ্তানিকারকও। নাফ নদেরে মায়ানমার অংশে নৌচলাচলের নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে। কমিশন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে আরাকান আর্মির বাধার মুখে পড়ে মায়ানমারের জুন্টা সরকার সীমান্ত বাণিজ্য একপ্রকার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন শতাধিক আমদানি ও রফতানিকারকও। আরাকান আর্মির বাধায় মায়ানমার থেকে টেকনাফ স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বন্দরের লোকসান হচ্ছে ৩০ লক্ষ টাকা। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে ১৫ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের টেকনাফের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘৯ মাস ধরে সীমান্ত বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ থাকায় আমাদের মাসে ৩০ লাখ টাকা করে প্রায় তিন কোটি টাকার লোকসানের মধ্য রয়েছি। তাছাড়া বন্ধের সময় আমরা ১৫ কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’
আরাকান আর্মির দাপট কেমন, সেটা একবার তুলে ধরা দরকার। গত ২৩ ডিসেম্বর টেকনাফে দুটি ট্রলারসহ ১৩ জন জেলেকে তারা ধরে নিয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ট্রলার দুটি শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া নৌঘাটের ও টেকনাফের খাইয়ুকখালির। টেকনাফ স্থলবন্দর কাস্টমস ও ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, সর্বশেষ গত ১২ এপ্রিল আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত মংডু এলাকা থেকে দুটি কাঠের বোট বন্দরে আসে।
দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সীমান্ত বাণিজ্য ফের চালুর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বাণিজ্য স্বাভাবিক না হলে শুধু স্থানীয় অর্থনীতি নয়, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থাও বড় সংকটে পড়বে। বিশেষ করে শ্রমিক, ট্রাকচালক, সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী, কর্মচারীসহ পাঁচ হাজারের বেশি কর্মহীন মানুষদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। আবার অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার জনবলও এলাকা থেকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বন্দর সচল করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা সম্প্রতি একটি মতামত পাঠিয়েছি’। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাবনা ছিল, মিয়ানমারে আটকে থাকা পণ্যগুলো কীভাবে নিরাপদে টেকনাফ স্থলবন্দরে আনা যায়, সে ব্যবস্থা করতে।’ কিন্তু সে দেশে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এখনও সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।












Discussion about this post