গত বছর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের দাবি একাধিকবার করেছে। এমনকি মার্কিন নাগরিক খলিলুর “রজার” রহমান নামে এক অনাবাসী বাংলাদেশিকে সাদরে এনে তদারকি সরকারে স্থানও করেদিয়েছিলেন ইউনূস সাহেব। সেই খলিলুর রহমান প্রথমে ছিলেন ইউনূস সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেসেন্টেটিভ। যা ছিল সহকারী উপদেষ্টা পদমর্যাদার। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূস খলিলুর রহমানকে সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করে দেন। ফলে তাঁর ক্ষমতা বারে অন্তরবর্তীকালীন সরকারে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার কোনও সমাধান সূত্র বের হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি আজ পর্যন্ত। ফলে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গারা নাকি এবার সশস্ত্র যুদ্ধে নামার জন্য তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এমনই দাবি করা হয়েছে। যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ব্যাপারটা ঠিক কী হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরগুলিতে?
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও উখিয়া অঞ্চলে প্রায় ৩৩টি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির আছে। জানা যায় সেখানে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকেন। এই সমস্যা আজকের নয়, কয়েক দশক ধরে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মির তাড়া খেয়ে বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন। কালে কালে সেই সংখ্যা ১৪ লক্ষে পৌঁছে যায়। রাষ্ট্রপুঞ্জ এই শিবিরগুলির জন্য একটা ভালো অর্থ বরাদ্দ করতো। যাতে শরণার্থী শিবিরগুলিতে জরুরি সাহায্য, যেমন খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। বাংলাদেশ সরকার এই দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু রোহিঙ্গারা তাঁদের মাতৃভূমি ফিরতে চান, কতদিন আর শরণার্থী হয়ে পড়দেশে থাকবেন? কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেটা নিয়ে আলাপ আলোচনা চালালেও কোনও সমাধান হয়নি। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসার পর, রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ অনেকটা কমে যায়। ফলে চরম সংকটে পড়ে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে জানা যাচ্ছে, রোহিঙ্গারা সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। যা বাংলাদেশের নতুন মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, এমনটাই দাবি ওয়াকিবহাল মহলের।
বিবিসি বাংলা বলছে, চট্টগ্রাম ও উখিয়ার বহু রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন জিহাদ ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণরা চাইছে তাঁরাও স্বাধীন একটি দেশ তৈরি করবে। এর জন্য তাঁরা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে। উল্লেখ্য, এই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলিতে যে ১৪ লক্ষ শরণার্থী থাকে তাঁদের ৩৭ শতাংশই বয়েসে তরুণ। যাদের মধ্যে অধিকাংশ জিহাদী মন্ত্রে উদ্ভুদ্ধ হয়েছে। সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্ৰুপ। তাঁরাই এই শিবিরগুলিতে সমীক্ষা চালিয়ে এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। যা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। এখন প্রশ্ন হল, কারা রোহিঙ্গা যুবকদের জিহাদি মন্ত্রে যুদ্ধে যেতে উদ্ভুদ্ধ করছে? জানা যাচ্ছে, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসও, ইসলামিক মহজ এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির মতো কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সংগঠন এখন এক ছাতার নিচে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, এই কাজটা করেছে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। তাঁদের সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন ও জামায়তে ইসলামী। সাধারণ রোহিঙ্গারা বলছেন, এই সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময় মিটিং করে তাদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে এবং মিয়ানমারের আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে একটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরিরও প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা। কারণ রোহিঙ্গাদের এই বিদ্রোহ আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সফল হবে না। যে আরাকান বাহিনী শক্তিশালী মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে দেশ পুনরুদ্ধার করা অবাস্তব চিন্তা। কিন্তু রোহিঙ্গারা যদি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়. তার ফলে বাংলাদেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। এর পরিণতি হবে সত্যিই ধ্বংসাত্মক।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বর্তমান তদারকি সরকার আবার তলে তলে রাখাইন মানবিক করিডোরের মাধ্যমে আরাকান আর্মিকে সাহায্য করতে উদ্যোগী হয়েছে। যা নিয়েও ক্ষিপ্ত বাংলাদেশেরই একটা বড় অংশ। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে রাখাইন করিডোর তৈরির চেষ্টা করছেন ইউনূস ও খলিলুর জুটি। যার মাধ্যমে আরাকান আর্মিকে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। এটা হলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। তাই হয়তো রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশ সরকারের ভরসা না করেই নিজেরাই জিহাদ ও যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চাইছে। জানা যাচ্ছে, ইতিমধ্যেই ১০০ থেকে ২০০ জনের দলে ভাগ হয়ে রোহিঙ্গা যুবকরা মিয়ানমারে ঢুকছে। রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি চাইছে আরও বড় আকারে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরোদস্তুর যুদ্ধে যেতে। আর এটা হলে নতুন করে অশান্ত হবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের মতো এলাকা। যা সামলাতে পারবে না বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।










Discussion about this post