মাত্র দুই দিন আগেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেছিলেন আমি এটাকে মব বলছি না, বলছি প্রেসর গ্রুপ। তাঁর দাবি ছিল, এটা সম্মিলিতভাবে দাবি আদায়ের একটা প্রক্রিয়া। অথচ, সেই প্রেসার গ্রুপ যে তাঁকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখবে, সেটা তখন তিনি ঘ্রুণাক্ষরেও জানতেন না। আসলে ভাগ্যদেবী তখন অদৃষ্টে বসে হাসছিলেন। গত শনিবার বিকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব খুলনা প্রেস ক্লাব পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। আর সেখানেই তাঁকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে আতঙ্কের “মব” নামক উশৃঙ্খল ছাত্র-জনতা। খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে তিনি মবের শিকার হয়ে যান। মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতারাই এই অবরোধের মূলে ছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগ নিয়ে কোনো ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত প্রেস সচিবকে বের হতে দেওয়া হবে না।
উল্লেখ্য জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় জড়িত এসআই সুকান্তকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দারের পদত্যাগের দাবিতে বুধবার থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছে ছাত্র-জনতা। শনিবার খুলনায় গিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও করেন। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ তিনি খুলনা প্রেসক্লাবে যান। এরপরই আন্দোলনকারীরা সেখানে গিয়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন এবং পুলিশ কমিশনারের অপসারণ দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এদিকে রাত বাড়তে থাকে, ভিতরে তখন অবরুদ্ধ স্বয়ং প্রেস সচিব। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যার ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে আর বলে দিতে হবে না। ফলে তাঁকে হাতের কাছে পেয়েই ঘিরে ধরেন ছাত্র-জনতার ভিড় গিয়ে পড়ে খুলনা প্রেস ক্লাবের গেটে। এই ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিবাদকেই মব জাস্টিস বলা হচ্ছে। এই ছাত্র-জনতা বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গত বছর জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ঘটিয়েছিল। এরাই এখন বাংলাদেশে মব সৃষ্টি করে বিভিন্ন নৈতিক ও অনৈতিক দাবিদাওয়া আদায় করছে। আবার এরাই মব সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে তৎকালীন সময়ের আমলা-পুলিশ আধিকারিকদের মারধোর করছেন। এই মবের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আঘিকারিক পর্যন্ত। অথচ এই শফিকুল আলমই দুই দিন আগে বলেছিলেন, এদের মব বলা যায় না। এরা একটা প্রেসার গ্রুপ, যারা দাবি আদায়ের জন্য এসব কাজ করছে। মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারও বিভিন্ন সময় মব নিয়ন্ত্রণের বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করেনি। ফলে যা হওয়ার তাই হল। মবের খপ্পরে পড়ে গেলেন স্বয়ং মহাপ্রতাপশালী প্রেস সচিব শফিকুল আলম। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যে শেষ পর্যন্ত পুলিশ, সেনাবাহিনী ও নৌ বাহিনীর সদস্যদের ডাকতে হয়। প্রায় সাড়ে চার-পাঁচ ঘণ্টার অবরুদ্ধ থাকার পর যৌথবাহিনীর কড়া পাহাড়ায় শফিকুল আলমকে উদ্ধার করে বের করে আনতে হয়েছে। এসময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদও।
অপরদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, খুলনা পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দারের অপসারণ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। তাঁদের বক্তব্য, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের কাছে আমাদের দাবি জানিয়েছি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করছেন বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করবেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন।’ ছাত্রনেতারা আগামী ২৪ ঘণ্টা বিষয়টি দেখবেন। তারা বলেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ কমিশনারকে অপসারণ করা না হলে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর ও আটটি থানা ঘেরাও কর্মসূচিসহ খুলনা অচল কর্মসূচি দেওয়া হবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সমস্ত ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কোনও এক অদৃশ্য কারণে প্রেস সচিবের অবরুদ্ধ হয়ে থাকার ঘটনার সংবাদ গণমাধ্যমগুলি ডিলিট করে দেয়। পরে প্রেস উইংয়ের থেকে জারি করা একটি সাধারণ বিবৃতির বরাত দিয়ে নতুন করে খবর করা হয় গণমাধ্যমগুলিতে। তাতে বলা হয়েছে, প্রেস সচিব নিজেই নাকি আলোচনার জন্য খুলনা প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলেন। তিনি মবের দ্বারা অবরুদ্ধ হননি। এই সমস্ত দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, শাক দিয়ে কি মাছ ঢাকা যায়?











Discussion about this post