বাঙালির স্বাধীন জাতিসত্তা তথা পৃথক জাতি রাষ্ট্রের চেতনা নীহিত রয়েছে একমাত্র বাংলাদেশে। একটি রাষ্ট্র একটি ভাষার দ্বারা আবদ্ধ। সেই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল এক মহান মুক্তিযুদ্ধোর মাধ্যমে, যার সত্ত্বা ছিল সেই ভাষা। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পরও বাংলাদেশে পাকিস্তানের সত্ত্বা পুরোপুরি বিনিষ্ট হয়নি। ফলে বাংলাদেশ বারে বারে অশান্ত হয়েছে। হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান, সেনাশাসন সবকিছুতেই যেন পাকিস্তানের ছোঁয়া। কিন্তু এর মধ্যেও কয়েকটি প্রত্যাবর্তন হয়ে উঠেছে জাতিসত্ত্বার প্রতীক হয়ে। যেমন বাহাত্তরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ। আবার ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন। ওই দুটি দিনের সঙ্গেই এবার যুক্ত হল ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সত্যিই “বড়দিন” হয়ে উঠবে কিনা সেটা ইতিহাসই বলবে। তবে আপাতত মনে করা হচ্ছে, অশান্ত ও দিকভ্রষ্ট বাংলাদেশের জন্য আজ একটা সত্যিই বড় দিন।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশে ফিরলেন বাংলাদেশের সাবেক সেনানায়ক তখা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান জিয়া। যার পিতা-মাতা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক চাঞ্চল্যকর নাম, তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে যে হইচই হবে সেটা না বলে দিলেও হবে। কারণ, পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার অর্থ ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাওয়া। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এক তখাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেথ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ক্ষমতায় আসে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। তারেক রহমান, যিনি বিএনপির এক জনপ্রিয় যুব নেতা ছিলেন, ২০০৮ সালে তাঁকে লন্ডন চলে যেতে হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ নেওয়া, অর্থ পাচার, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপে যুক্ত থাকার মতো মোট ৮৪টি মামলা ছিল। লন্ডনে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু এই ১৭ বছরে তিনি ব্রিটেনের নাগরিকত্ব পাননি। অর্থাৎ নির্বাসিত পরবাসই ছিল শাস্তি। এই পরিস্থিতিতে তাঁর দেশে ফেরার নানা সমস্যা ছিল। কেউ কেউ বলেন, বাংলাদেশ সেনার তৎকালীন কয়েকজন শীর্ষ আধিকারিকদের কাছে নির্দিষ্ট মুচলেকা দিয়েই তিনি লন্ডনে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছিলেন। সেই মুচলেকায় তিনি বলে গিয়েছিলেন তিনি আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করবেন না। এমনকি তাঁর মা বিএনপির সর্বোচ্চ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও সে সময় আলাদা একই মুচলেকা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে। আর সেগুলোই তারেক রহমানের জন্য দেশে ফেরার অন্তরায় হয়ে ছিল। এমনকি কয়েকদিন আগেও যখন খালাদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখনও তারেক ফেসবুক পোস্টে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, তাঁর দেশে ফেরা তাঁর একক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে না। তবে কোনও এক অদৃশ্য জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সেই বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে গেল, আর তারেক স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ঢাকার ফ্লাইটে চেপে বসলেন। যদিও নিন্দুকেরা বলছেন, দিল্লির বিশেষ অনুমোদন এবং অনুমতি সাপেক্ষে তারেক দেশে ফিরছেন। ভারত সরকার তাঁর প্রত্যাবর্তনকে কীভাবে নেবে এ নিয়ে স্বয়ং তারেক জিয়া এবং তাঁর দল বিএনপিও সংশয়ে ছিল। সম্প্রতি সেই সংশয় দূর হয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের খবর।
এর অর্থ, তারেককে বাংলাদেশে ফেরার জন্য যে তৃতীয় পক্ষ বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাঁরা এখন সেই বাঁধা সরিয়ে নিয়েছে। যদি দিল্লি সেই কাজটা করে থাকে, তাহলে এটা অবশ্যই একটা দুর্দান্ত কূটনৈতিক চাল সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ লক্ষণীয় বিষয় হল, বিগত কয়েক মাস তারেক জিয়া এবং বিএনপি ভারত বিরোধী সুর নরম করেছে। যেখানে গোটা বাংলাদেশ এখন ভারত বিরোধিতায় টগবগ করে ফুটছে। উ্ল্টে দেখা যাচ্ছে, তারেক-সহ বিএনপি নেতারা তাঁদের একাধিক ভাষণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা-সমালোচনা করছেন। অতীতে বিএনপির নির্বাচনী প্রচারে মুক্তিযুদ্ধকে এত আন্তরিকভাবে তুলে ধরার নজির খুব একটা নেই। এর পিছনে ভারতের ভূমিকা কত সেটা সঠিকভাবে জানা না গেলেও এই কৌশল বিএনপিকে এবার জামাত বা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিগুলির সাথে লড়াই করতে সাহায্য করবে। অনেকেই বলছেন, এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছেন তারেক। একদিকে বাংলাদেশে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট তাঁদের বাক্সে টেনে নেওয়া যাবে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক কথা বলে ভারতকেও তারা খুশি করা যাবে। তবে দেশে ফেরার পর তারেক জিয়া ভোল পাল্টে আগের মতোই ভারত বিরোধিতা বজায় রাখেন কিনা সেদিকে কৌতূহলী মানুষের নজর থাকবে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post