৫৪ বছর আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী গেরিলা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতি পশ্চিম পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। মাত্র ৯ দিনের যুদ্ধে পরাজিত হয় পাকিস্তান, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন প্রায় ৯৩ হাজার পাক সেনা। জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। ৫৪ বছর ধরে ভারতের এই অবদান শিরধার্য করে রেখেছিল বাংলাদেশের মানুষজন। কিন্তু কয়েকটি স্বাধীনতা বিরোধী সংগঠন বাংলাদেশের বুকে টিকে ছিল কোনও এক সময় পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে মিশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। আর এদেরকেই কাজে লাগিয়ে মার্কিন ডিপ স্টেট নিজেদের কার্যসিদ্ধি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটিয়ে দেয় এক তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। তাঁদের সর্বতভাবে সাহায্য করেছিল পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছিল সেই গণঅভ্যুত্থানের অংশ হিসেবেই। ক্ষমতায় এসেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। যা মূলত মার্কিন ডিপ স্টেটের হাতের পুতুল। এরপর কেটে গিয়েছে ১৫ মাস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে তাঁদের কার্যসিদ্ধি করতে পেরেছে কিনা, সেটা তর্কের বিষয়। তাঁরা বাংলাদেশে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে পারলো কিনা, সেটা সময় বলবে। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে যে ভারতের ভাবনার বদল ঘটেছে, সেটা অনেকেই বিশ্বাস করছেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্রিয় সমর্থনের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ তাঁদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি, তাঁর স্মৃতিবিজরিত বাড়ি ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর ভেঙে ফেলার পাশাপাশি আরও অনেক কাজ করেছে যা ভারত ভালোভাবে নেয়নি। এরমধ্যে অন্যতম হল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ আজ পাকিস্তানের সঙ্গেই গদগদ সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছে। ভারতের শত্রু দেশের সঙ্গে তাঁদের এই সখ্যতাও নয়া দিল্লিকে চিন্তায় রেখেছে। এখানেই শেষ নয়, মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের ইউনূস সরকার দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বদলে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। তাতে শুধু ভারত নয়, ক্ষিপ্ত চিন ও রাশিয়াও। বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করছে, পাকিস্তান থেকে যুদ্ধাস্ত্র কেনার কথা বলছে। সবমিলিয়ে নয়া দিল্লিকে চাপে রাখার সবধরণের কৌশল নিয়েছে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও কয়েকবার ভারতের উত্তরপূর্বের সাতটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্স নিয়ে হুমকি দিয়েছেন। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে।
পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলা এবং তার পরবর্তী অপারেশন সিঁদুর ভারতকে বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, যেহেতু ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালাচ্ছে, তাই দিল্লির উচিত ঢাকার উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা। বিশেষজ্ঞদের আরও দাবি, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে, বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি অস্বাভাবিক কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এরকম একটি পদক্ষেপ ছিল এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত সামরিক মহড়া আকাশ বিজয় ২০২৫। এই মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং কৌশলগত সক্ষমতা প্রদর্শন করা। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদর দফতরের নির্দেশনায় সকল ঘাঁটি এবং ইউনিট যুদ্ধ বিমান, পরিবহন বিমান, হেলিকপ্টার, মনুষ্যবিহীন বিমান বা ড্রোন, রাডার সিস্টেম এবং বিভিন্ন বিমান প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম-সহ এই মহড়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এই মহড়ায় পাকিস্তানের মদত ছিল এবং কিছু কারিগরি সহায়তাও ছিল। ওই মহড়ায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন। তিনি কূটনৈতিক ভাষায় একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন: “আমরা এমন একটি পৃথিবীতে বাস করি যেখানে যুদ্ধের হুমকি প্রতিনিয়ত ঘনিয়ে আসছে। উল্লেখযোগ্যভাবে সে সময় তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান।
আবার বাংলাদেশের লালমণিরহাট বিমানঘাঁটি নিয়ে ইউনূসের উচ্চাকাঙ্খি সিদ্ধান্ত নিয়েও চিন্তায় ভারত। কারণ ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেক থেকে ওই বিমানঘাঁটির দূরত্ব মাত্র ১৫০ কিমি মতো। এই বিমানঘাঁটি চিনকে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। প্রসঙ্গত পহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার অনেক আগে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার চারজন ঊর্ধ্বতন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ২৩ জানুয়ারী কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। ওই প্রতিনিধিদলটি বেশ কয়েকটি বিমান ঘাঁটি এবং সামরিক স্থাপনা পরিদর্শন করেছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছিল বলে জানা গিয়েছে। আবার বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি বাংলাদেশী প্রতিনিধিদল ১৩ থেকে ১৭ জানুয়ারির মধ্যে পাকিস্তান সফর করেছিলেন। পরবর্তী সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একাধিক প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলির অনুমান, পরবর্তী সময় ভারত-পাক সংঘাতে পাকিস্তান সেনা বাংলাদেশের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ভারতে হামলা চালাতে পারে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান থেকে সরাসরি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে বেশ কয়েকবার জাহাজ ভিরেছিল। তাতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কিছু নামানো হয়েছিল। আবারও ভারত অপারেশন সিঁদুরের দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষয়ে চুরান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে এবার শুধু পাকিস্তান নয়, দিল্লির নজরে বাংলাদেশও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েকদিন আগেই যে কলকাতায় একটা বড় সামরিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, সেটা এমনি এমনি নয়।












Discussion about this post