সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ করছে যে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন প্রভাব অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে। সেই প্রভাব আর কয়েকদিনের মধ্যেই উধাও হয়ে যাবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। এবার আসা যাক মূল কথায়। বিগত কয়েক বছরে ভারতের আশেপাশে কয়েকটি দেশে আচমকাই নির্বাচিত সরকার পরিবর্তন হল। পাকিস্তান, শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও নেপালে সরকার বিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক পালাবদলের ধরণ পুরো এক রকম। অর্থাৎ, রিজিম চেঞ্চের ধরণ এক। মার্কিন ডিপ স্টেট এভাবেই কাজ করে, যেখানে মার্কিন স্বার্থ রয়েছে অথচ সেই দেশের সরকার ওয়াশিংটনের কথা মানছে না, সেখানেই হয়েছে সরকার বদলের খেলা। তারপর হাতের পুতুল কাউকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে সেই দেশের মাথায়। যেমন পাকিস্তান, সেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ইমরান খানের দল সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু আচমকা এক সরকার বিরোধী আন্দোলন ও ইমরান খান জেলবন্দি হল। তারপর সেনা সমর্থত এক পুতুল সরকার গঠন হল শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বে। যারা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথায় ওঠে বসে। একই চিত্র আমরা দেখেছি বাংলাদেশে, তবে কোনও ভাবে ভারতে পালিয়ে আসেন শেখ হাসিনা। নাহলে তাঁর হালও আজ ইমরান খানের মতোই হতো। অপরদিকে শ্রীলংকা ও নেপালেও একই ঘটনা ঘটল, তবে ওই দুই দেশে মার্কিন স্বার্থ রক্ষিত হয়নি সেভাবে। কারণ ভারতের প্রভাব সেখানে কাজ করেছে এবং পুনরায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফিরে আসছে। কিন্তু পাকিস্তানকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে শুরু করেছিল মার্কিন ডিপ স্টেট। কিন্তু এই মুহূর্তে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেঁকে বসেছেন। তাঁর নীতি, আর রিজিম চেঞ্জের খেলায় থাকবে না যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই কথাটা স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম সদস্যা, তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহাপরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড। তিনি সম্প্রতি নতুন মার্কিন নীতি সম্পর্কে খোলাসা করেছেন। তাঁর দাবি, সরকার পরিবর্তনের পুরোনো নীতির দিন শেষ, যুক্তরাষ্ট্র আর সে পথে হাটবে না। বরং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের পথেই হাটবে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও এর ইঙ্গিত আগেই দিচ্ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট পদে বসেই যিনি মার্কিন ডিপ স্টেটের পর্দা ফাঁস করেছিলেন। ইউএস এআইড মারফত কোন দেশে কত কোটি ডলার খরচ করেছিল পূর্বতন বাইডেন প্রশাসন সেটা ফাঁস করেছিলেন। জানা গিয়েছিল, বাংলাদেশের জন্য ২৯ মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছিল। যা হাসিনা সরকার উৎখাতে ব্যবহার হয়েছিল।
কিন্তু পরের গল্পটা খুব করুণ। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেও মার্কিন স্বার্থ যে খুব একটা রক্ষিত হয়েছে তার প্রমাণ কম। উল্টে বাংলাদেশে কট্টরপন্থী মৌলবাদী শক্তির উত্থান হয়েছে, যা পশ্চিমি দুনিয়ার জন্য একটা লাল সতর্কতা। ঠিক যেমনটা তুলসী গ্যাবার্ড বলেছেন। তাঁর কথায়, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও কোনও লাভের লাভ হয়নি, বরং ওই অর্থ আইসিস বা আল কায়দার মতো জঙ্গি সংগঠন পুস্ট হয়েছে। মৌলবাদী শক্তির প্রসার হয়েছে। তাই এই টাকা আর খরচ করবে না ট্রাম্প প্রশাসন। বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে নজর দেওয়া হবে। আমরা দেখলাম, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বাণিজ্য চুক্তি ঝুলে থাকলেও নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন হয়ে গেল ১০ বছরের জন্য। যা ভারত ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিরক্ষা সমঝোতা অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। কারণ দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবলমাত্র অস্ত্র কেনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি হস্তান্তরও রয়েছে। এর অর্থ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকেই ফের কৌশলগত সহযোগী মেনে নিল যুক্তরাষ্ট্র। এবার ধীরে সুস্থে বাণিজ্য চুক্তিও হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, দীর্ঘকাল বাদে ওয়াশিংটন ঢাকায় স্থায়ী রাষ্ট্রদূত পাঠালো। ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন নামের ওই রাষ্ট্রদূত ঢাকায় এসেই ইউনূস সরকারকে চাপ দিতে শুরু করেছে যে চিনের সঙ্গে কোনও প্রকার প্রতিরক্ষা সমঝোতা করা যাবে না। সবমিলিয়ে প্রবল চাপে মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবার তাঁর মাথার উপর থেকে হাত তুলে নিচ্ছে। উল্টে ভারতের দিকে নতুন করে ঝুঁকছে ওয়াশিংটন। এখন পাকিস্তানই তাঁর শেষ ভরসা। ফলে দ্রুত বদলে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রথম বলি কি মুহাম্মদ ইউনূস? জানা যাচ্ছে, উপদেষ্টামণ্ডলীতে তাঁর রাশ অনেকটাই আলগা হয়ে গিয়েছে। কেউ তাঁর কথা শুনছেন না। তিনি এখন কার্যত একা।












Discussion about this post