বাংলাদেশ কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নতুন এক সংকট ডেকে আনবে? বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ২৪ ঘন্টা আগে এমনই এক সাংঘাতিক প্রশ্ন তুলে দিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষক মাইকেল রুবিন। যিনি বর্তমানে পেন্টাগনের অত্যন্ত ঘনিষ্ট ও অন্যতম পরামর্শদাতা। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশ ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য মাথাব্যাথার কারণগুলি তুলে ধরেন। সেইসঙ্গে বাংলাদেশে বাড়তে থাকা কট্টর মৌলবাদী শক্তিগুলি সম্পর্কেও সতর্ক করেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কি নীতি হতে চলেছে, মাইকেল রবিন তারই ব্যাখ্যা দিলেন। উল্লেখ্য ওই অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য উপস্থিত ছিলেন। মাইকেল রুবিন বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ইসলামপন্থী সংকট এবং তুরস্ক ও ইরানের ঐতিহাসিক সাদৃশ্য তুলে ধরেন। ফলে বিষয়টি এবার গুরুতর।
মাইকেল রুটিন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই সপ্তাহ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন বাংলাদেশে ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হয় এবং তাঁদের দমন করার জন্য প্রয়োগ করা শক্তি যখন অগ্রাসী হয়ে ওঠে, তাতে হাজারের উপর মৃত্যু ডেকে আনে। যার পরিণতিতে বাংলাদেশের তৎকালীন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির প্রতিষ্ঠাতার কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ভারতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। মাইকেল রবিনের দাবি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন্ট প্রশাসন বাংলাদেশে আন্দোলনরত ছাত্রদের পক্ষে ছিল। তাঁর আরও দাবি, বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগত রাগ ও বিদ্বেষ তাঁদের সঠিক মূল্যায়ন ও চিন্তাভাবনাকে ম্লান করে দিয়েছিল। ফলে তারা সহজেই একটি মিথ্যা বর্ণনা বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে “স্বৈরাচারী একনায়ক হাসিনা বাংলাদেশে নিরীহ শিক্ষার্থীদের হত্যা করেছেন”। কিন্তু পরবর্তী সময় ব্যালিস্টিক প্রমানাদি দেখায় যে ছাত্ররা নির্দোষ থাকলেও কিছু লোক পাকিস্তানের সরবরাহকৃত গোলাবারুদ দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর গুলি চালিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালা বদল ঘটে গিয়েছে।
মাইকেল রুনিনের দাবি, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর, জামায়াতে ইসলামী প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় বাংলাদেশে। ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে তাঁদের ফ্রন্টম্যান হিসেবে ব্যবহার করে জামায়াত বাংলাদেশের প্রশাসনে ছড়ি ঘোরাতে থাকে। ডঃ ইউনূস ছিলেন পশ্চিমাদের জন্য নিখুঁত মুখ। বিল এবং হিলারি ক্লিনটনের সাথে তাঁর দীর্ঘ বন্ধুত্ব রয়েছে এবং তিনি ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের জন্য ঘন ঘন বক্তা হিসেবে কাজও করেন। অপরদিকে শেখ হাসিনার ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। যার মূলে রয়েছে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল গঠনের ইচ্ছা এবং তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাসিনার দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করার উৎসাহ।
মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণের পর কারাগার থেকে দণ্ডিত সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান ও হিন্দুদের লক্ষ্য করে ইসলামপন্থী চরমপন্থীদের নির্যাতনের খোলা ছাড় দেন। মাইকেল রুবিন স্পষ্ট করেছেন, ইউনূস অনেকটা বার্মিজ রাজনীতিবিদ এবং প্রাক্তন নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির মতোই আচরণ করেছেন। যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। ওই বক্তৃতায় মাইকেল রবিন মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকার কথা তুলে ধরে আরও বিস্ফোরক কিছু মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেছেন এখনও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রক ঘুমিয়ে আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন সম্প্রতি, ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকর্তার একটি টেপ রেকর্ডিং। যা নিয়ে খবর প্রকাশিত করেছিল ওয়াশিংটন পোস্ট। যেখানে দাবি করা হয়েছে, কোনও এক মার্কিন কূটনৈতিক বাংলাদেশের ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে থাকা একটি উগ্রপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে আবেদন করছেন।
পাশাপাশি তিনি গত সোমবার স্বাক্ষরিত মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির উদাহরণ দিয়েছেন। এরপরই তিনি বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে উদ্দেশ্য করে বলেন, রুবিওর স্পষ্ট করে বলা উচিত যে, যখন একজন অনির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান সে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেন, তখন সেই নির্বাচনের কোনও বৈধতা থাকতে পারে না। মাইকেল রুবিনের দাবি, বাংলাদেশিদের সামনে এখন তিনটি বিকল্প আছে। তাঁরা যদি বুঝতে পারে যে ইউনূস এবং জামায়াতে ইসলামী তাঁদের বোকা বানাচ্ছে, ফলে তাঁরা ফের রাস্তায় ফিরে যেতে পারেন। গ্রেনাডার পথে যেতে পারে এবং ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে দিতে পারেন। এবং বাংলাদেশকে মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় খরগোশের গর্তে পড়তে দিতে পারেন। উল্লেখ্য এই মাইকেল রুবিন গত বছর মার্চে আরও একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আজকের বাংলাদেশ ২০০০ সালের আফগানিস্তানের মতো। খেলাফত-এ-মজলিস, আল্লাহ’র দল এবং আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ এখন হিফাজতে ইসলামের অধীনে একত্রিত হয়ে “বাংলাদেশ আফগানিস্তান হবে, এবং আমরা তালেবান হব” এই ব্যানারে সমগ্র বাংলাদেশে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা করছে। আজও তাঁর মন্তব্য সেই দিকে। ধরেই নেওয়া যায়, মুহাম্মদ ইউনূসের রাজনৈতিক ভবিষৎ কতটা অনিশ্চিত।












Discussion about this post