গত বছর জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে চলছিল তীব্র সরকার বিরোধী আন্দোলন। ছাত্র-জনতার সেই আন্দোলন দমন করতে নাকি বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিল। প্রথমদিকে এ আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও একপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়। অনেক প্রাণহানি ঘটে। বিপরীতে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষের রোষানলে। আপনারা একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ঠিক একই সময় ব্রিটেনেও একটা সরকারবিরোধী আন্দোলন দানা বেধেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল সে সময়। কিন্তু ব্রিটেন সরকার সেই আন্দোলন কঠোর হাতেই দমন করেছিল। অপরদিকে বর্তমান সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্প বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক শহরে। সেখানেও দেখা যাচ্ছে মার্কিন সেনা নামিয়ে আন্দোলন দমন করছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু “যত দোষ নন্দ ঘোষ” প্রবাদের মতোই সমস্ত আলোচনা বাংলাদেশকে ঘিরে। জাতি সংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত রিপোর্টে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। কেন? যেখানে সরকার বিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে পশ্চিমা দেশগুলি কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, সেখানে শেখ হাসিনা সরকার নিলেই দোষ? এবার সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠছে, জাতিসংঘ এ হেন মিথ্যা রিপোর্ট দিল কেন? কার নির্দেশে এই দ্বিচারিতা?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর থেকে জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে গেজেট প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে তালিকা প্রকাশ করে তাতে ৮৩৪ জনের নাম শহীদের নাম ছিল। পরে জুন মাসে প্রকাশিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪ জন। নানা বিতর্ক ও অভিযোগের পর জানা যায়, জুলাই শহীদের সংখ্যা কমতে কমতে এই মুহূর্তে সাতশোর নীচে অর্থাৎ ৬৫০ জনের কাছাকাছিতে নেমেছে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ বাংলাদেশ সংক্রান্ত রিপোর্টটি পেশ করে। যেটা ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। সেই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘণের ব্যাপক প্রমান পাওয়া গিয়েছে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের মানবাধিকার দল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে কাজ শুরু করেছিল। বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণেই জাতিসংঘ মানবাধিকার দল পাঠায় বলেই দাবি। অভিযোগ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনে পুলিশ হত্যা নিয়ে একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গড়েছিলেন এবং জাতিসংঘকেও আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সে সময় জাতিসংঘের তরফে কোনও সাড়া মেলেনি। অথচ মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়ে জাতিসংঘ। এই দলটি নাকি ২৩০টির বেশি গোপন জবানবন্দি রেকর্ড করেছিল। পাশাপাশি তদন্তকারী দল গোটা বাংলাদেশ ঘুরে নানান তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছিল। ফরেন্সিক পরীক্ষাও করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা কেবলমাত্র ছাত্রদের দাবিগুলিরই তদন্ত করেছিল। এর প্রমান হল জাতিসংঘের রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙচুর, মেট্রো রেলে আগুন-সহ একাধিক সরকারি দফতর ও কার্যালয়ে ভাঙচুর অগ্নিসংযোগের উল্লেখ করেনি। এমনকি পুলিশ হত্যা নিয়েও জাতিসংঘের রিপোর্টে সেরকম কিছু নেই। অপরদিকে, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছর জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র আন্দোলনের সময় বাংলাদেশে ৩,২০৬ জন পুলিশকর্মী-আধিকারিক নিহত হয়েছিলেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, ‘কোনটি গণহত্যা? ৩২০৪ জন পুলিশ হত্যা নাকি তাঁর বিপরীতে আত্মরক্ষার জন্য মারা যাওয়া সাড়ে ৬৫০ ছাত্র?’ জানা যায়, জাতিসংঘের দলটি বিএনপি ও জামাত নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করে ইসলামী ছাত্র শিবির। তাই জাতিসংঘের রিপোর্টে তাঁদের উল্লেথ নেই।
জাতিসংঘের মানবাধিকার রিপোর্টে মৃতের তালিকা নিয়েও হয়েছিল তুমুল বিতর্ক। ওই রিপোর্টে উল্লেখ ছিল, জুলাই আগস্ট গণআন্দোলনের সময় ১৪০০ জন ছাত্র-জনতার মৃত্যু হয়েছিল। এই সংখ্যা তাঁরা কোথা থেকে পেলেন, বা কে তাঁদের এই তথ্য জানিয়েছিল সেটা নিয়েই একাধিক সংগঠন প্রশ্ন তুলছে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারই যে তথ্য দিচ্ছে তাতে এখনও পর্যন্ত সাড়ে ছশো মৃত্যুর উল্লেথ রয়েছে। জাতিসংঘ রিপোর্টে উল্লেথ করেছে ওই সময়ে ৭৮ শতাংশ মৃত্যু হয়েছিল রাষ্ট্রীয় অস্ত্রে। কিন্তু পরবর্তী সময় সরকারের একাধিক রিপোর্ট ও দাবিদাওয়াতেই রয়েছে উল্টো চিত্র। আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল বিদেশী অস্ত্র ও স্নাইপার রাইফেল। এমন ধরণের বহু অস্ত্র পরবর্তী সময় সেনাবাহিনী উদ্ধার করেছে।
আসল বিষয় হল, জাতিসংঘের প্রধান অ্যান্তোনীয় গুতারেসের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্টতা ও মাখামাথি নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশে এসেছিলেন। ফলে জাতিসংঘ যে ত্রুটি পূর্ণ রিপোর্ট দিয়েছে সেটাও কেন এটা বলে দিতে হবে না।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post