বুধবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে ‘ডেমোক্রেসি ডায়াস বাংলাদেশ’ এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। সেখানে অন্যতম বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি-র সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর ভাষণে উঠে আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজকর্মের নানা দিক। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই অনুষ্ঠানে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যাওয়ার সময় এসেছে। তাদের এখন ‘এক্সিট পলিসি’ নিয়ে চিন্তা করা উচিত। এ সরকার কী পদ্ধতিতে যাবে, সেটা এখন পরিষ্কার করা জরুরি। তারা যে কাজকর্মগুলো করেছেন, আগামী সরকার সেইগুলোকে সম্পূর্ণভাবে বৈধতা দেবে কি না, এ বিষয় কিন্তু এখনও সামনে রয়ে গিয়েছে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতো অর্থনীতিবিদ যখন প্রকাশ্যেই সরকারের সমালোচনা করছেন, বা এই সরকারকে সরে যাওয়ার কথা বলছেন, তখন বিষয়টি গুরুতর।
যেমন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেছেন, ‘দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও এ সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার যত দিন ক্ষমতায় থাকবে, সংকট ততই গভীর হবে। উল্লেখযোগ্য দিক হল ওই সেমিনারে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকাল, সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেছিল ডেমোক্রেসি ডায়াস বাংলাদেশ। তাতে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বের ২৬টি দেশে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল। যার মধ্যে ১৬টি দেশই খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করেছিল। ওই দেশগুলিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাকি দশ দেশের মতো নির্বাচনের ধার ধারছে না। তাঁরা আরও দীর্ঘসময় ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চাইছে। উল্লেথযোগ্য বিষয় হল, গত বছর ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী কয়েকমাস মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনপ্রিয়তার শিখড়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা এবং দেশে দীর্ঘস্থায়ী অরাজক পরিস্থিতি তাঁদের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করছিল। এর মধ্যে যুক্ত হয়, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, শিল্পের হার কমে যাওয়া, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ। সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর দোসররা এখন খলনায়কের ভূমিকায় চলে এসেছেন। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে সরে যাওয়ার পরামর্শই দিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
‘ডেমোক্রেসি ডায়াস বাংলাদেশ’ আয়োজিত সেমিনারে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, ‘সংস্কারের নামে সময়ক্ষেপণ করে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। তাঁর দাবি, পিআর পদ্ধতি ভালো হলেও এখন তা সময়োপযোগী নয়। আসলে জামায়াত ও এনসিপি সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির দাবি করছে। এর অর্থ প্রথমে স্থানীয় নির্বাচন, পরে জাতীয় নির্বাচন। অপরদিকে বিএনপি প্রচলিত সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতির পক্ষে অনড় অবস্থানে রয়েছে। ওই সেমিনারে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, বাংলাদেশে আগের যে তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, তাদের প্রত্যেকেরই একটা নিষ্ক্রমণ পথ বা ‘এক্সিট পলিসি’ ছিল। জিয়াউর রহমান যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন উনার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। ফলে সংসদও কাজ করেছিল জিয়াউর রহমানের পক্ষে। অপরদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টির মাধ্যমে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী পর্যন্ত যে সমস্ত বিষয় ছিল, সেগুলিকেও তিনি সাংবিধানিক বৈধতা দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার যে কাজকর্মগুলো করেছে, আগামী সরকার সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে বৈধতা দিবে কিনা- এই বিষয় কিন্তু এখনো সামনে রয়ে বলেই অভিমত ব্যক্ত করছেন বেশিরভাগ বিশ্লেষকরা। এই প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দাবি করেন, শুধু নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আমরা যে চিন্তিত, সেটা নয়। কী কী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই সরকারকে আমরা নিয়ে এসেছিলাম, সেইটা সমাপনের ক্ষেত্রে কী কী করে যাচ্ছেন ইউনূস সরকার সেটাও একটা বিষয়। আবার আগামী সরকারের জন্য কী কী রেখে যাচ্ছেন তিনি, সেটা নিয়েও একটা স্বচ্ছ বক্তব্য দিতে হবে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে। তাঁর মতে, একটা ‘এক্সিট টাস্ক রিপোর্ট’ করার সময় এসে গিয়েছে। সেটা না হলে তাঁর সামনে যে সমুহ বিপদ, এটাও বুঝিয়ে দেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ।












Discussion about this post