যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভে উত্তাল ঢাকার রাজপথ, সরকারি কর্মচারিরা পথে নেমে আন্দোলনে ব্যস্ত, সাধারণ মানুষ উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস চার দিনের জাপান সফরে উড়ে গেলেন। মঙ্গলবার মধ্য রাতে প্যাসিফিক এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে জাপানের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর দলবল। জাপান সফরে প্রধান উপদেষ্টা নিক্কেই ফোরামের ‘ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে যোগ দেবেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন তাঁর প্রেস উইং। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিগত ৯ মাসে মুহাম্মদ ইউনূস ৯ বার বিদেশ সফর করেছেন। যা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ সরীফের থেকেও বেশি, তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির থেকে কম বলে জানাচ্ছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল।
মাস দুয়েক আগে সংসদে দাঁড়িয়ে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা রাজ্যসভায় জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের মে মাস থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে ৩৮টি বিদেশ সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর তাতে খরচ হয়েছে ২৫৮ কোটি টাকা। তবে নরেন্দ্র মোদির বিদেশ সফরে যত খরচই হোক না কেন, তাতে ভারতে বিনিয়োগ যেমন আসে, বহু ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয় আর ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানও মজবুত হয়। যার নমুনা সম্প্রতি অপারেশন সিঁদুরের সময় দেখা গিয়েছে। ভারত পাকিস্তানের মাটিতে একাধিক হামলা চালানোর পরও বিদেশী কোনও রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে একটা শব্দও খরচ করেনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত ঘনঘন বিদেশ সফর করে মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের জন্য কি আনতে পেরেছেন?
আল জাজিরার তদন্তমূলক বিভাগের সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফর নিয়ে কার্যত তুলোধনা করেছেন। তিনি লেখেন, যে কোনও দায়িত্বশীল, সদিচ্ছাসম্পন্ন সরকার প্রধানের পরিস্থিতির উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। কিন্তু জনাব ইউনূস একটি অস্থায়ী, অনির্বাচিত সরকারের প্রধানের জন্য আরেকটি অপ্রয়োজনীয় সফরে যাচ্ছেন। জুলকারনাইন আরও লিখেছেন, মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর থ্রি-জিরো ধারণার ওপর বক্তৃতা প্রদানের জন্যই বিদেশ সফর করেন, যা বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। যার ফলাফল এখনও দেখা যায়নি। ওই সাংবাদিক আরও লিখেছেন, মূলত নিক্কেই ফোরামে বক্তৃতা দিতে তিনি জাপান উড়ে গিয়েছেন। আর এই সফরের ন্যায্যতা প্রমানের জন্য তিনি হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে বৈঠক করবেন যা তাঁর প্রেস উইং ফলাও করে প্রচার করবে। জাপান থেকে ফেরার দশ দিনের মধ্যেই তিনি ফের ব্যক্তিগত একটি সফরে বিদেশ যাবেন, যেখানে তিনি একটি পুরস্কার গ্রহন করবেন। আর এই সফরগুলিতে তিনি একা যান না, সঙ্গে একটা বড় দল থাকে। জুলকারনাইনের দাবি, যা মূলত তাঁর ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং বাড়ানোর জন্যই। আর সব খরচ রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। তবে আসল প্রশ্নটা উপসংহারে তুলেছেন আল জাজিরার সাংবাদিক। তিনি লিখেছেন, যদি তিনি একজন নির্বাচিত সরকার প্রধান হতেন, তাহলে আমরা সফরের ফ্রিকোয়েন্সি এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতাম। আমাদের কি এখন একই কাজ করা উচিত নয়? সময় এসেছে তাকে জবাবদিহি করার। দেশটা কারো বাপের না!
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং দাবি করেছেন, তার সফরের সময় বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার ঘোষণা করতে পারে জাপান। এর মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন বাজেটারি সহায়তা হিসেবে, ২৫০ মিলিয়ন রেল ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য এবং ২৫০ মিলিয়ন অন্যান্য খাতের জন্য। এছাড়া জাপানের সঙ্গে সাতটি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি সই হতে পারে বলেও দাবি করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সেই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, জাপানের সহায়তায় মাতারবাড়ি, মহেশখালি এলাকা আগামীদিনে একটা সিঙ্গাপুর হবে।
তবে বাংলাদেশের সমকাল পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাপান থেকে পুরোনো প্রযুক্তির প্রিপেইড গ্যাস মিটার কিনছে বাংলাদেশ। সরকার টু সরকার পদ্ধতিতে এসব মিটার কেনার জন্য জাপান থেকে ঋণ নিতে হবে কঠিন শর্তে। ঋণ দেবে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন । এই ঋণের আওতায় আট লাখ গ্যাস মিটার কিনতে বাংলাদেশের খরচ হবে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। প্রতি মিটারের পেছনে ব্যয় হবে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এই চুক্তি নিয়ে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। সবমিলিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ঘনঘন বিদেশ সফর থেকে কি পাচ্ছে বাংলাদেশ এখন সেটা নিয়েই কাঁটা ছেঁড়া শুরু হয়েছে।












Discussion about this post