ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর দু-দিনের মার্কিন সফরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। এরমধ্যে অন্যতম নাম হল তুলসী গ্যাবার্ড। যিনি আমেরিকার প্রথম হিন্দু কংগ্রেসওম্যান, যিনি সদ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগের নতুন অধিকর্তা হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আর দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পরদিনই তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসলেন। যা নিঃসন্দেহে নজীরবিহীন। তুলসী একদিকে যেমন হিন্দু, অন্যদিকে ইসকনের অন্যতম সদস্য। তাঁকে রাজনীতির ফাঁকে ইসকনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা যায় গিটার হাতে হরে কৃষ্ণ গানে বুঁদ হতে। এহেন একজন গোয়েন্দা অধিকর্তা যথন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে বসেছেন তখন কপালে দুঃখ নাচছে বাংলাদেশের।
কারণ, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে বাংলাদেশের জেলে বন্দি ইসকনের সন্নাসী তথা পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিম্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু। কার্যত বিনা বিচারেই তিনি জেলবন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহের। বাংলাদেশে পালা বদলের পর সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নানা অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে রংপুরে দুটি বিশাল সমাবেশ আয়োজন করেছিল সে দেশের হিন্দু সংগঠনগুলি। এই সমাবেশে মুখ্য আয়োজক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস অগ্নিগর্ভ বক্তৃতার মাধ্যমে তুলোধোনা করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারের। স্বভাবতই সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভু বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও তদারকি সরকারের চক্ষুসুল হয়ে পড়েছিলেন। চট্টগ্রামের এক বিএনপি নেতা তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করে, আর সেই সূত্রে সন্ন্যাসীকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশের পুলিশ। প্রসঙ্গত তুলসী গ্যাবার্ড নিজে ইসকনের সদস্য এবং নিজেকে হিন্দু পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। স্বভাবতই তিনি বাংলাদেশের তদারকি সরকারের এহেনও কাজ পছন্দ করবেন না এটাই স্বাভাবিক। ফলে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বই থাকে এই প্রসঙ্গ যে ওঠেনি সেটা কেউ হলফ করে বলতে পারবেন না। নরেন্দ্র মোদি দেশে ফিরে এসেছেন, এবার বাকি কাজটা তুলসী গ্যাবার্ড সারবেন। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা পরিচালক হিসাবে তার দায়িত্ব ও কাজের পরিধি বিশাল। তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্ররের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তুলসী গ্যাবার্ড দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দুটি যুদ্ধেও সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। ২০০৪-০৫ সালে ইরাক ও কুয়েত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বড় ভূমিকায় ছিলেন তুলসী। এখন পদাধিকার বলে তিনি মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগের মহা পরিচালক। তাঁর অধীনে থাকবে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক, স্বরাষ্ট্র ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলি মিলিয়ে মোট ১৮টি সংস্থা। যদিও গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করার সেরকম কোনও অভিজ্ঞতা নেই তুলসীর। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরে তিনি বহু চর্চিত নাম। রাজনৈতিক জীবনের প্রথমদিকে তুলসী ছিলেন ডেমোক্রাট দলের প্রতিনিধি। কিন্তু বিদেশী রাষ্ট্রগুলির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাক গোলানো নিয়ে তিনি প্রতিবাদ করেন এবং রিপাবলিকান পার্টিতে যোগদান করেন। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্টতা বাড়ে। বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তুলসী গ্যাবার্ড এখন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগের সর্বোচ্চ পদে বসেছেন।
ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে বাংলাদেশের তদারকি সরকার গ্রেফতার করার পরই ইসকন এর প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল তুলসীকে। এরপর বিনা বিচারে তাঁর দীর্ঘদিন জামিন না হওয়া নিয়েও চিঠি গিয়েছে তাঁর কাছে। ভারতের তরফেও এই বিষয়ে বিশদ তথ্য দেওয়া হয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ডের কাছে। সবমিলিয়ে ইসকন সদস্য তুলসী যে এবার চুপ থাকবেন না এটা পরিষ্কার। সদ্য দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি, দফতরের কাজকর্ম বুঝে নিয়েই তিনি বাংলাদেশ ইস্যুতে কাজ শুরু করবেন, এটা অনেকেই মনে করছেন। ফলে আগামীদিনে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু ও বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতন, হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় কোনও পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অবাক হওয়ার কোনও কারণ নেই। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও হিন্দুদের উপর নির্যাতন নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ যে রিপোর্ট দিয়েছে সেটাও তুলসী গ্যাবার্ডের হাতে পৌঁছে গিয়েছে এতক্ষনে। সবমিলিয়ে তুলসীকে নিয়ে এখন রীতিমতো আতঙ্কে মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর সরকার।












Discussion about this post