শনিবার বিকেলে আচমকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করে দেন তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্ট করে। তিনি জানান, রাতভর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের সংঘাত মেটানোর জন্য মধ্যস্থতা করে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এর এক ঘন্টা পরই ভারতের বিদেশ সচিব সংক্ষিপ্ত এক সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়ে দেন, শনিবার বিকেল পাঁচটা থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ বিরতি লাগু হয়েছে। কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথায় ভারত সংঘর্ষ বিরতি করল সে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে কংগ্রেস সহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। এমনকি কূটনৈতিক মহলের কেউ কেউ এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ভারত কেন সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা করল বা ভারত আদৌ সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা করেছিল কিনা সেটা নিয়েও কূটনৈতিক মহলের একাংশ আলোচনা করছে। এর ভিতরে রহস্যটা কি আসুন সেটা নিয়ে একবার আলোচনা করা যায়।
বিক্রম মিশ্রীর এই বক্তব্যে পরিষ্কার পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মহাপরিচালক ভারতীয় সেনাবাহিনীর মহাপরিচালককে ফোন করে সংঘর্ষ বিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ভারত কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার কথা স্বীকার করেনি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন একটি হলো মধ্যস্থতা অন্যটি হলো সংঘর্ষ বিরতি বা “সিজফায়ার”। ভারত কোনটাই বলেনি, বরং ভারতের বক্তব্য ছিল পাকিস্তানের ডাইরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশন ফোন করার পর সিদ্ধান্ত হয় একে অপরকে আক্রমণ করবে না সেটা জলে আকাশে বা স্থলে। এরপর ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি এক্স পোস্ট কার্যত এই বিতর্কে ইতি টেনে দেয়। বিমানবাহিনী সমাজ মাধ্যমে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, অপারেশন সিঁদুর বন্ধ হয়নি , বা স্থগিত করা হয়নি। তাহলে সংঘর্ষ বিরতি বিষয়টি এক্ষেত্রে অকার্যকর বলাই যায়। কিন্তু প্রথমদিকে ভারতীয় গণমাধ্যম মার্কিন প্রেসিডেন্টের টুইট ধরেই সি সিজফায়ার শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করে। ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসও প্রশ্ন তুলতে শুরু করে কেন চাপে থাকা পাকিস্তানকে সুযোগ করে দিলেন নরেন্দ্র মোদি? কেনই বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতজানু হলেন নরেন্দ্র মোদি? এমনকি কংগ্রেস ইন্দিরা গান্ধীর প্রসঙ্গ তুলে নরেন্দ্র মোদিকে বিধতে শুরু করে। যদিও এই প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরাসরি কোনও কথাই বলেননি। যা জবাব দিয়েছে ভারত সরকার। প্রসঙ্গত শনিবার বিকেলে সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পাকিস্তান থেকে ফের ড্রোন হামলা শুরু হয়। বিশেষ করে জম্মু ও পাঞ্জাব সেক্টরে ড্রোন হামলা হয়েছে সেই সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এলওসি বরাবর পাকিস্তান ফের গোলাবর্ষণ করতে শুরু করে। ভারত যে তার মোক্ষম জবাব দিয়েছে মধ্যরাতেই ভারতের বিদেশ সচিব সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়ে দেন।
রবিবার দিনভর ভারত বিভিন্নভাবে বুঝিয়েছে যে করোও হস্তক্ষেপ না, করোও চাপে না, ভারত নিজের ইচ্ছায় ও পাকিস্তানের আর্জি মেনেই সংঘর্ষবিরতি করেছিল। কিন্তু যখন পাকিস্তান সেই শর্ত লঙ্ঘন করেছে, তখন ভারতও মোক্ষম জবাব দিয়েছে। ভারত কি কি জবাব দিয়েছে? আসুন শুনে নেওয়া যাক।
সরাসরি না বললেও, ভারতের সেনাকর্তারা ঘুরিয়ে বলছেন যে ভারত পাকিস্তানের অন্তত ১০টি সেনা ও বিমানঘাঁটিতে ব্রহ্মোস, হ্যামার এবং স্ক্যাল্প ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যা অপারেশন সিন্দুরের চেয়েও বড় আকারের পদক্ষেপ বলেই ব্যাখ্যা করেছেন ভারতীয় সামরিক কর্তারা। অর্থাৎ তাঁদের কথায় পরিষ্কার, এটা যুদ্ধের থেকে কোনও অংশে কম নয়।
অনেকেই এখন মেনে নিচ্ছেন, শনিবার ভোরে চাকলালায় পাকিস্তানের নূর খান বিমান ঘাঁটিতে ভারতের আক্রমণ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে প্রতিকূলতার উত্তেজনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নূর খান ঘাঁটিতে ভারতের আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ভারত প্রায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ইউনিটের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঠিক এই কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এতটা অগ্রাসী মনোভাব নিয়েছেন ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ থামানোর ব্যাপারে।
এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, সেটা হল গত ২৪ ঘন্টায় পাকিস্তানের দুটি ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ করা গিয়েছে। একটি ৪. ০ ও অন্যটি ৫. ০ রিখটার স্কেলে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত পাকিস্তানের পারমানবিক কেন্দ্রগুলিকে আক্রমণ করেছে, সেই কারণেই ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ বিমান যা পারমাণবিক রেডিয়েশন নির্ণয় করার কাজে ব্যবহৃত হয় সেটিকে স্পট করা গিয়েছে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডীর আশেপাশে। সেই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতটা আগ্রহী হয়েছিল এই সংঘর্ষ বিরতি স্থাপনের জন্য। কারণ সূত্রের খবর অনুযায়ী পাকিস্তানের পারমানবিক কেন্দ্র গুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার তত্ত্বাবধানে রয়েছে। যদি ভারত পাকিস্তানের এরকম কোন পারমাণবিক লঞ্চপ্যাড আক্রমণ করে থাকে তাহলে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অসম্মানজনক।
এক্ষেত্রে ইন্দিরা গান্ধীর প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসের আক্রমণ কতটা কার্যকরী , সে প্রশ্নই উঠছে। ১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন তাতে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একথা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেবার সুযোগ পেয়েও ভারত শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেক আকারে বর্ধিত করতে পারেনি। ভারত ৯৩ হাজার যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি কে তিন বছর ধরে আটকে রেখেও পরে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে বড় কথা ৫৪ জন ভারতীয় সেনা যারা পাকিস্তানের হাতে বন্দি ছিলেন তাদেরকে নিয়ে আসতে পারেননি ইন্দিরা গান্ধী। তাহলে আজকে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার অধিকার কংগ্রেসকে কে দিয়েছে এই প্রশ্নও উঠছে।












Discussion about this post