পরেশ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন উলফা-আইয়ের একাধিক শিবিরে ড্রোন হামলা হয়েছে। জানা যাচ্ছে, একটা নয় দু’বার ড্রোন হামলা হয়েছে। তাতে উলফা সহ ভারতের অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্যদের হতাহেতের খবর আছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই হামলার দায় কেউই স্বীকার করেনি। এমনকি ভারতীয় সেনাও নয়। ফলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কে বা কারা এই জঙ্গি সংগঠনগুলির শিবিরে ড্রোন হামলা চালালো তা নিয়ে ধন্ধ রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র এবং উলফা বিবৃতি অনুযায়ী এই হামলা একদিন নয়, বরং দুদিন ধরে চলেছে। প্রথমদিনে ২০০-র বেশি ড্রোন হামলা হয়েছে বলে দাবি। দ্বিতীয় দিন ১৫০-এর কাছাকাছি ড্রোন হামলা হয়েছে। ফলের সভাপতি প্রশ্ন উঠছে এত পরিকল্পিত ড্রোন হামলা কে বা কারা করল? ভারতীয় সেনাবাহিনী বা বিমান বাহিনী কেউই এই ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেনি। অথচ উলফা বা মনিপুরের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নবাদী সংগঠনের গোপন ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা হল। প্রাণ গেল সেকেন্ড ইন কমান্ড-সহ একাধিক জঙ্গি নেতার। তাও কি ভাবে? প্রথম হামলায় প্রাণ গিয়েছিল নয়ন অসম নামে এক উলফা নেতার। পরদিন তাঁর শেষকৃত্যে অংশ নিতে এসে একাধিক জঙ্গিনেতার মৃত্যু হয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে।
ভারতের নিষিদ্ধ ঘোষিত ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম (ইন্ডিপেন্ডেন্ট) বা উলফা (আই), যারা আসামের স্বাধীনতা লড়াই করছে বলে দাবি। যার নেতৃত্বে পরেশ বড়ুয়া, যিনি হয় চিনে নয়তো বাংলাদেশে রয়েছেন। এই জঙ্গিগোষ্ঠী ভারত- মায়ানমার সীমান্তের সাগিয়াং অঞ্চলে ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঘাঁটি তৈরি করেছে। একটি নয় একাধিক ঘাঁটি, যেখানে তারা জঙ্গি প্রশিক্ষণ দেয়। সূত্রের খবর, ওই সব ঘাঁটিতেই ড্রোন ও ক্ষেপনাস্ত্র হামলা হয়েছে। এই হামলায় হামলায় তাদের তিন শীর্ষ নেতা নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সন্ত্রাসী সংগঠন উলফা রবিবার বিবৃতি জারি করে তাদের মোবাইল ক্যাম্পগুলিতে হামলার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে। যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনী এই হামলায় কোনও ভূমিকা অস্বীকার করেছে। তাহলে এই হামলা কারা চালালো?
উলফা, কয়েক দশক ধরে ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী কাজকর্ম চালিয়ে আসছিল। এই সংগঠনের একটি অংশ ইতিমধ্যেই ভারত সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু আরেকটি অংশ আলফা-আই বা ইনডিপেনডেন্স নামে নিজেদের বিচ্ছিন্নতাবাদী কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল। এর নেতৃত্বে ছিলেন পরেশ বড়ুয়া। যাকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে আজীবন কালাবাসীর নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে পরেশ বড়ুয়ার শাস্তি কমিয়ে ১৪ বছর কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করা হয়। পরেশ বড়ুয়া পলাতক। গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, পরেশ বড়ুয়া চিনে একটি বিবাহ করেছেন এবং সেই দেশে বসবাস করেন। মিয়ানমার-ভারত ও চিন সীমান্ত এলাকায় তার গতিবিধি বরাবরই লক্ষ্য করা গিয়েছে। চিনের থেকেও তিনি অস্ত্রশস্ত্র ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পান। একেবারে ভারত সীমান্ত লাখোয়া মিয়ানমারের গভীর জঙ্গলের ভিতর যে প্রশিক্ষণ শিবির গুলি উল্ফা ও মনিপুরের জঙ্গি সংগঠনগুলি চালায় তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে চিনের সেনা ও পাকিস্তানের আইএসআই। এবার এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সদরঘাঁটি লক্ষ করেই হল ড্রোন হামলা। যদিও উলফার দাবি, হেয়ার স্ট্রাইক এর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও হামলা চলেছে।
ভারত গত মাসে পাহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানের মাটিতে সরাসরি আক্রমণ চালায়। অপারেশন সিঁদুর নামে ওই অভিযানে নটি জঙ্গি ঘাঁটি ও পরবর্তী তিন দিনে পাকিস্তানের ১২ থেকে ১৮ টি সামরিক ও বিমান ঘাঁটি ধ্বংস করেছে ভারতীয় সেনা। ভারতের বর্তমান নীতি হলো যেকোনো জঙ্গি কার্যকলাপ যা ভারতের বিরুদ্ধে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে সেটাকেই যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হবে। সেটা যে কোন দেশেই হোক না কেন ভারত সেখানে কড়া পদক্ষেপ নেবে। মিয়ানমারের ড্রোন হামলা কি সেই নীতিরই একটি অঙ্গ? উচ্ছে প্রশ্ন।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও কূটনৈতিক মহলের একটা অংশ মনে করছেন এর পরের পালা বাংলাদেশ। বাংলাদেশে যেভাবে জঙ্গি কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভারত বিরোধী নানারকমের কার্যকলাপ বাড়ছে, সরাসরি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফেও ভারত বিরোধী নানারকম হুমকি দেওয়া হচ্ছে সেটা কিন্তু ভারতের বর্তমান নীতিমালার বিপক্ষে। হলে এবার যদি মিয়ানমারে উলফা-ক্যম্প ধ্বংস করে দেওয়ার মতো, বাংলাদেশেও একাধিক ড্রোন এটাক বা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।












Discussion about this post