বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে আরও একজনের মৃত্যুর খবর এল। ফলে সরকারি মতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হল পাঁচ। যদিও বেসরকারি মতে গোপালগঞ্জের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা আরও বেশি। যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি করেছিলেন বুধবারের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে কোনও বিতর্ক নেই। সেটা হল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা। যে সেনাবাহিনী গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র ও জনতার আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছিলেন। সেই সেনাবাহিনীই এবার এনসিপি নেতাদের বাঁচাতে গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। আর এর একাধিক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এখানেই শেষ নয়, সেনাবাহিনীর জওয়ানরা গোপালগঞ্জের মানুষদের আটক করে কিভাবে অত্যাচার করেছে তারও কয়েকটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। পাশাপাশি অনেকেই দাবি করছেন, বুধবারের হামলায় যারা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বা গুরুতর আহত হয়েছিলেন, তাঁদের প্রশাসন ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠায়নি। এমনকি পরিবারকেও সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। আওয়ামী লীগের অভিযোগ, একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে, সেখানে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে টার্গেট করে গুলি করো। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যারা গোপালগঞ্জের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কি তাঁদের ভুমিকা পরিবর্তন করেছেন? নাকি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান নিজের অবস্থান পরিবর্তন করলেন?
বুধবার গোপালগঞ্জে এনসিপি একটু ভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছিল। গোটা দেশে যেখানে তাঁরা জুলাই পদযাত্রার আয়োজন করছে, সেখানে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের জন্মভূমিতে মার্চ ফর গোপালগঞ্জের ডাক দিয়েছিল। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এখানেই একটা কায়দা আছে। সেটা হল এই ধরণের কর্মসূচির অর্থ হল কোনও কিছু দখলের ডাক দেওয়া। যেমন এর আগে বাংলাদেশের কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠনগুলি মার্চ ফর খিলাফৎ ও মার্চ ফর গাজা কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। এমনই এনসিপি মার্চ ফর গোপালগঞ্জের ডাক দিয়েছিল। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী পরে দাবি করেন তাঁদের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল। কিন্তু এতবড় ঘটনা ঘটে যাবে সেটা আন্দাজ করতে পারেনি তাঁরা।
তাহলে কি এই অশান্তি বাড়তে দেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগকে আরও চাপে ফেলতে? যে গোপালগঞ্জ মুজিবর রহমান ও শেখ হাসিনার জন্মস্থান। সেই গোপালগঞ্জ, টুঙ্গিপাড়া আওয়ামী লীগের গড় হবে এটা বলাই বাহুল্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলেও সাধারণ মানুষের মন থেকে নৌকা চিহ্ন মুছে ফেলবে এটা ভাবাও অন্যায়। তবুও কিভাবে সাবধানতা অবলম্বন করা হল না, এই প্রশ্নও উঠছে। অপরদিকে বাংলাদেশ পুলিশ স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাঁরা প্রাণঘাতী কোনও অস্ত্র ব্যবহার করেনি। যদিও তাঁদের হাতে এমন কোনও অস্ত্র দেওয়াও হয়নি। ফলে গোটা ঘটনার দায় গিয়ে পড়ছে সেনাবাহিনীর উপর। কয়েকটি ভিডিওতে দেখাও গিয়েছে সেনাবাহনীর অতি সক্রিয়তা। গোপালগঞ্জের মতো ছোট একটি শহরে এতগুলি সাঁজোয়া গাড়ি বা সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত আর্মাড ভেহিকেল নিয়ে প্রবেশ করা। সেই গাড়িতে প্রথমে এনসিপি নেতাদের লুকিয়ে গোপালগঞ্জ থেকে বের করে আনা। আবার পরে সেনাবাহিনীর জওয়ানদের গুলি, কাঁদানে গ্যাসের সেল ছুঁড়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে প্রতিহত করা। এই সব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করে দিল। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীর ভূমিকার তীব্র নিন্দা করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর রাষ্ট্রসংঘের শান্তি মিশনে ডাক পাবে না।
প্রসঙ্গত, বুধবার মধ্যরাতে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে উৎক্ষাতের ডাক দিয়েছিলেন মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনা। ভারত থেকেই এক অডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘যার যা আছে, তাই নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। এই মুহূর্তে মানুষকে প্রতিবাদে সামিল হতে হবে। আসলে গোপালগঞ্জ তাঁকে সাহস জুগিয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও সাহস জুগিয়েছে। কিন্তু তাঁদের সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা। তাহলে কি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান নিজের প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরে আসছেন, নাকি তাঁর প্রতিই সেনাবাহিনীর একাংশ অনাস্থা প্রকাশ করতে শুরু করলো? গোপালগঞ্জ অনেক প্রশ্ন তুলে দিল।












Discussion about this post