বাংলাদেশে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস আসে, তখন সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কিন্তু একদল নব্য রাজনৈতিক নেতাদের জন্য এই দুর্যোগ যেন আশির্বাদ। ২০২৫ সালের বন্যার আশঙ্কায় যখন দেশবাসী শঙ্কিত, তখন জাতীয় নাগরিক পার্টির ব্যানারে এই নেতারাই মানুষের আবেগকে পুঁজি করে ফেনী বন্যার বন্যার্তদের জন্য প্রায় ১১ কোটি টাকা ত্রাণ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু সেই ত্রাণের টাকা কোথায় খরচ হল, কাঁদের সাহায্য করা হল, তা আর দেখা যায়নি। অভিযোগ, সেই ত্রাণের টাকায় কেনা হয়েছে বিলাসবহুল গাড়ি, যা নেতাদের ব্যক্তিগত প্রচারণায় ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এটা নিয়ে হইচই শুরু হতেই, হাসনাত আবদুল্লাহর মতো ছাত্র নেতারা ‘তহবিল সুরক্ষিত আছে’ এবং ‘অডিট রিপোর্ট আসছে’ বলে জনগণকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু সেই অডিট রিপোর্ট আজও দিনের আলো দেখেছে কিনা জানা যায়নি। বিগত এক বছরে, এই এনসিপি নামক নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে একশো-একটি অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেই অভিযোগ নিয়ে কোনও থানায় এফআইআর হয়েছে বা কোনও সংবাদপত্রে খবর ছাপা হয়নি। অথচ সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচই শুরু হওয়ার পর, সেই নেতারা যখন নিজেদের ফেসবুক পেজে দোহাই দেয়। সেটা নিয়ে সংবাদমাধ্যম একটি ক্ষুদ্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর শুরু থেকেই জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এরই মধ্যে দলের একজন যুগ্ম সদস্য সচিবকে দল থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে। এনসিপির শীর্ষ নেতা সারজিস আলম নিজ এলাকায় বিশাল গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম দুদক চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এগুলি ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। সম্প্রতি, ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা নেওয়ার সময় হাতে নাতে ধরা পড়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক শীর্ষ নেতা-সহ পাঁচজন। যা নিয়ে মুখ পুড়েছে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ এই সংগঠনের। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয়, যে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি বাদে অন্য সব কমিটি স্থগিত করতে হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, নাগরিক কমিটি এরকম নানা ব্যানারে গত বছর জুলাই আন্দোলন সংগঠিত করেছিল বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা। গত বছর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এই সংগঠনগুলির কয়েকজন শীর্ষ নেতারা জাতীয় নায়কের মর্যাদা পেয়েছিল। নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম-সহ আরও বেশ কয়েতজন। তাঁরা কার্যত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের সর্বময় কর্তা। তাঁরাই সরকারি শীর্ষ পদে কে বা কারা বসবেন ঠিক করছেন। পুলিশের কোন কর্মকর্তা কোথায় পোস্টিং পাবেন ঠিক করছেন। এমনকি কোনও কর্পোরেশনে কে মেয়র হবেন সেটাও ঠিক করে দিচ্ছেন। সেই ক্ষমতার সঙ্গে তাঁরা যে দুর্নীতি ও অনিয়ম করতে শুরু করেছিলেন সেটাও সামনে আসতে শুরু করে। চাঁদাবাজি, তোলাবাজিতেও এনসিপি অন্য সব রাজনৈতিক দলকে ছাপিয়ে যায়। উপদেষ্টা আসিফ মাহমূদ সজীব ভূঁইয়ার ব্যাগ থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে উদ্ধার হয় একে-৪৭ রাইফেলের তাজা কার্তুজ। সেই উপদেষ্টার বাবাকে নিয়ে নানা অভিযোগ। সারজিসের বিয়ের বিপুল খরচ কে দিলেন, সেটা নিয়েও ছিল বিস্তর প্রশ্ন। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম। যা মূলত এই নব্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের কার্যত জনবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে অপমান। বাংলাদেশের সংবিধানকে কবর দেওয়ার হুমকিও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি।
গণঅভ্যুত্থানের এক বছরও হয়নি। বাংলাদেশে হাওয়া ঘুরতে শুরু করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দিয়ে শুরু, জাতীয় নাগরিক পার্টি দিয়েই কি শেষ হয়ে যাবে এই নব্য স্বাধীনতা সংগ্রামী ছাত্র নেতাদের দৌঁড়াত্ম? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল অন্তত তাই মনে করছেন। তাঁদের দাবি, এনসিপি আসন্ন ভোটে কিছুই করতে পারবে না। বহু জায়গায় জামানতও জব্দ হতে পারে। কারণ, এই লাগামহীন দুর্নীতি এবং দাদাগিরি। যা বাংলাদেশের মানুষ ইতিমধ্যেই বয়কট করতে শুরু করেছে। প্রথমে গোপালগঞ্জ, পরে কক্সবাজারে এনসিপি ব্যাপক তাড়া খেয়েছে। এখন জানা যাচ্ছে, সেনাবাহিনীও তাঁদের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করেছে। আর এটা যদি হয়, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের এক বছরের মধ্যেই নাহিদ, সারজিস, হাসনাতরা নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হয়ে যাবেন।












Discussion about this post