বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের নানা জায়গায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল এবং সেই মিছিল থেকে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্লোগান শোনা এখন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ চলতি বছরের ২২ মে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্দেশিকা জারি করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এই নির্দেশিকার পরই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকদের ধরপাকড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। এমনকি অপারেশন ডেভিল হান্টের নামে কেবলমাত্র আওয়ামী কর্মী, সমর্থক, নেতাদেরই ধরে ধরে জেলে পুরেছে ইউনূস সরকার। তবুও দমানো যাচ্ছে না বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দলটিকে। যা এখন মুহাম্মদ ইউনূসের একমাত্র মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও গত মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টারন প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছিল বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মোটেই অবনতি হয়নি। তাঁদের বক্তব্য, পরিসংখ্যানগতভাবে নানা ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হলেও অনেক ঘটনা বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সংঘঠিত হয়েছে। কিন্তু সে সময় নিরাপত্তার অভাব থাকায় আক্রান্ত, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ থানায়, আদালতে যেতে পারেননি, তাঁরা এই আমলে অভিযোগ দায়ের করছেন বলেই এক ধাক্কায় নাকি পরিসংখ্যান বদলে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিগত ১৩ মাসে হত্যাকাণ্ডের হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, সেই দাবি নস্য়াৎ করতে গিয়েই এই বিবৃতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তাঁদের যুক্তি, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনকালে সংঘটিত অন্তত ১,১৩০টি হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তনের পরেই নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে বর্তমানে যে নতুন সহিংসতার ঢেউ বা মব সংস্কৃতি নিয়ে সমালোচনা চলছে, তাকে ইউনূসের সরকার দীর্ঘদিনের দমিত বিচার ব্যবস্থার প্রতিফলন দেখতে বলছে। এক কথায়, যত দোষ নন্দ ঘোষ বা বাংলাদেশে যে সমস্ত খারাপ ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে বা ঘটছে তার জন্য দায়ি একমাত্র শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ। সেই আওয়ামী লীগকে কার্যত বাংলাদেশ থেকে দূরে-বহু দূরে ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে তাঁদের সমস্ত কার্যক্রম যেমন নিষিদ্ধ, তেমনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও হয় জেলে না হল দেশ ছাড়া। তবুও কেন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে এত ভয় পাচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর দলবল?
সূত্রের খবর, আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকাতে বাংলাদেশের গোয়েন্দা-পুলিশ গত ১৫ দিনে ওই দলের অন্তত তিন হাজার নেতাকর্মীকে আটক করেছে। এর পরও ঠেকানো যাচ্ছে না আওয়ামী লীগের মিছিল। গত রবিবার সন্ধ্যায় জনা দশেক উপদেষ্টাকে নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। জানা যাচ্ছে, ওই বৈঠকের শুরুতেই দেশের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে ইউনূস জানান, যে ভাবে দিনদিন পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে, তাতে ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু ভোট করা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য এবং পুলিশের রিপোর্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকার রাস্তায় আওয়ামি লিগের সমর্থনে রোজই প্রায় মিছিল হচ্ছে। তিনি ওই বৈঠকে দাবি করেন, দেখে মনে হচ্ছে তাঁরা ভোট বানচালের ষড়যন্ত্রে মেতেছে। তবে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, ইউনূস আসলে ভোট বানচালের প্রসঙ্গ টেনে নিজের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ভয় ও আশঙ্কার কথাই বলেছেন। কারণ তিনি জানেন, এত বাঁধা-বিপত্তি এড়িয়ে যে ভাবে রোজ ঢাকার রাস্তায় আওয়ামী লীগের মিছিল হচ্ছে এবং তা দিন দিন বাড়ছে তাতে বেশিদিন তাঁদের আটকে রাখা যাবে না। সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াও আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে আওয়ামী লীগের মিছিলের খবর হচ্ছে। ফলে হাসিনার দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখা সম্ভব হবে না মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে। কারণ, ইতিমধ্যেই ইউরোপের কয়েকটি দেশ সরাসরি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে বাংলাদেশের ইউনূস সরাকরের সমালোচনা করেছে, নিন্দাও করেছে।
এই পরিস্থিতিতে আবার বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর বক্তব্য আরও আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে ইউনূস সরকারের। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সেনার সামরিক অপারেশন দফতরের কর্নেল স্টাফ শফিকুল ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, মব বা গণসন্ত্রাস সৃষ্টি করে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধকে ‘ছোট করার’ কোনও সুযোগ নেই।
একদিকে মবের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা তুলে ধরে সেনা কর্মকর্তা, অন্যদিকে তিনি বলছেন বম সৃষ্টি করে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধকে ‘ছোট করার’ কোনও সুযোগ নেই। আবার দেখা যাচ্ছে ঢাকার রাস্তায় আওয়ামী লীগের মিছিল দিন দিন বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নীতিও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সব দিক বিবেচনা করেই বলা যায়, আওয়ামী লীগের কাছে হার স্বীকার করে, ভাগ্যের ওপরেই নিজেদের ছেড়ে দিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর বাহিনী।












Discussion about this post