বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম সমুদ্রপথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক উচ্চাকাঙ্খী প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। যা সম্পূর্ণ হলে বদলে যাবে ভারতের অর্থনীতি, সেই সঙ্গে ভারত টেক্কা দেবে চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও। এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের গ্রেট নিকোবর দ্বীপকে নরেন্দ্র মোদি ভারতের হংকং বানাতে চাইছেন। উল্লেখ্য আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে গ্রেট নিকোবর দ্বীপের দূরত্ব ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশ থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার এবং মালাক্কা প্রণালী থেকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার। ৭২,০০০ কোটি টাকার গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের আওতায় গ্যালাথিয়া উপসাগরে একটি আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল, একটি গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর, একটি গ্রিনফিল্ড টাউনশিপ, একটি পর্যটন প্রকল্প ও একটি গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করতে চলেছে ভারত সরকার।
ভারতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রেট নিকোবর আগামীদিনে হংকংয়ের মতোই একটি বৃহৎ বাণিজ্যক হাব হয়ে উঠবে। এখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেড় লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকমানের ওই গ্রিনফিল্ড টাউনশিপে ভবিষ্যতে প্রায় চার লক্ষ মানুষের বাস হবে। যদিও এই প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, পরিবেশের ক্ষতি হবে বলে অনেকে আপত্তিও তুলছেন।
২০২১ সালে নরেন্দ্র মোদি মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত গ্রেট নিকোবর প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক কম না। বিশেষ করে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস-সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এর প্রবল বিরোধিতা করছে। মূলত ৯২১ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত এই দ্বীপের মাত্র ১৬৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি করা হবে গ্রেট নিকোবর মেগা প্রকল্প। কংগ্রেসের অভিযোগ, এই দ্বীপে কয়েকটি প্রাচীন জনজাতি রয়েছে, যেমন মাত্র ৩০০ সদস্যের শোম্পেন উপজাতি এবং নিকোবরিজ উপজাতি। এরা সভ্যতার ছোঁয়া থেকে বহু দূরে আদিম জীবন যাপন করে। এছাড়া রয়েছে আদিম রেনফরেস্ট। প্রকল্পের জন্য বনভূমি কাটতে হবে, এতে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে দাবি বিরোধী ও পরিবেশবিদদের একাংশের। কিন্তু কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের দাবি, এই প্রকল্প ভারতের অর্থনীতিকে এক অন্য মাত্রায় তুলে দেবে। এটা ভারতের নৌ সক্ষমতা, শক্তি প্রদর্শন, কৌশলগত ভূমিকা এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরে ভারতের বাণিজ্য অগ্রগতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর অবস্থানটিও দারুণ। মালক্কা প্রণালী হয়ে কলম্বোর মাঝে টেন ডিগ্রি চ্যানেল হয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যর যে গুরুত্বপূর্ণ রুট রয়েছে, গ্রেট নিকোবর দ্বীপের অবস্থান এর মাঝামাঝি। ভারত এই বন্দরটি স্থাপনের মাধ্যমে, মালাক্কা প্রণালী থেকে আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনের ২০-৩০ শতাংশ দখল করে বিদেশী বন্দরগুলির উপর নির্ভরতা কমাতে চায়। কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন, কৌশলগতভাবে এই বন্দর ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে। সেই সঙ্গে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের অবস্থান আরও সুরক্ষিত করতে পারে। আসলে বিশ্ব বাণিজ্যর প্রায় ৬০ শতাংশ তেলবাহী এবং এক-তৃতীয়াংশ পণ্যবাহী জাহাজ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। এই গ্রেট নিকোবর থেকে মালাক্কা প্রণালির দূরত্ব মাত্র ৪০ কিলোমিটার।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআইয়ের সমুদ্রপথে প্রভাব মোকাবিলা করতে বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করতে চাইছে নয়াদিল্লি। গ্রেট নিকোবর থেকে ভারতীয় নৌবাহিনী সহজেই দক্ষিণ চিন সাগর ও ভারত মহাসাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে নজরদারি চালাতে পারবে। পাশাপাশি ভারতকে ঘিরে ফেলতে চিনের ‘মুক্তার মালা’ বা স্ট্রিং অব পার্লস কৌশলের পাল্টা হিসেবে ভারত এই বন্দরকে ব্যবহার করতে পারবে বলেও মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও একটা বার্তা দেওয়া যাবে যে ভারত মহাসগরীয় এলাকায় ভারতই শেষ কথা বলবে। ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গ্রেট নিকোবরের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনালের ধারণক্ষমতা হবে ১৬ মিলিয়ন কনটেইনার প্রতি বছর। যা শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের দ্বিগুণ এবং সিঙ্গাপুরে বন্দরের প্রায় অর্ধেক। উল্লেখ্য, ভারতে সেরকম গভীর সমু্দ্র বন্দর না থাকায়, ভারতকে কলোম্বো, সিঙ্গাপুর এবং দুবাই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। ভারতে বিশালাকায় কন্টেনার জাহাজ প্রবেশ করার কোনও বন্দর নেই। গ্রেট নিকোবরে এই সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে চায় ভারত, এতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মিলিয়ন ডলার বেঁচে যাবে। পাশাপাশি ‘দ্য গ্রেট নিকোবর’ প্রজেক্টে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলেও আশাবাদী ভারত সরকার। সেই সঙ্গে চিন ও আমেরিকাকেও বার্তা দেওয়া যাবে, বাংলাদেশ নিয়ে তাঁদের পরিকল্পনা ভবিষ্যতে মাঠে মারা যাবে। কারণ, গ্রেট নিকোবরে আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা চালু হয়ে গেলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের গুরুত্ব কমে যাবে।












Discussion about this post