বর্তমানে বাংলাদেশের চট্টগ্রামকে ঘিরে এক অদ্ভুত ভূ-রাজনৈতিক খেলা শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই এলাকার দিকে নজর দিয়েছে। সেই সঙ্গে চিন চাইছে চট্টগ্রাম বন্দরের দখল নিতে। অন্যদিকে ভারতের নজর চট্টগ্রামের পাশেই মংলা বন্দরের দিকে। কেন আচমকা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? উত্তরটা আসলে লুকিয়ে পড়শি দেশ মিয়ানমারের মাটির নিচে। আসুন দেখা যাক বিষয়টা আসলে কি।
২০২১ সালে সামরিক বাহিনী অং সান সু চির নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এই ঘটনা মিয়ানমারকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। মিয়ানমারের সামরিক জুন্টা শাসক মিন অং হ্লাইং চিনের প্রতি অনুগত থাকেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যত বয়কট করে আসছিলেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যান্য দেশের মতোই মিয়ানমারকে ট্যারিফ চাপিয়েছেন। তবে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ উচ্চ ট্যারিফ বসিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আশ্চর্যের বিষয় হল, মিয়ানমারের সেনা শাসক মিন অং হ্লাইং এটাকে তাঁর সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখেছেন এবং ট্যারিফ কমানোর কোনও আবেদন না জানিয়ে উল্টে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি লিখে ধন্যবাদ জানান। যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আমরা সবাই জানি, দীর্ঘ কয়েক দশক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের দিকে নজর দেয়নি। কিন্তু ইদানিং তাঁরা মিয়ানমারে প্রবেশের সবরকম চেষ্টা চালাচ্ছে। কেন এই পরিবর্তন? এর সব রহস্য লুকিয়ে আছে মিয়ানমারের কচিন রাজ্যের মাটির নিচে। যা নিয়ে বিশ্বের তিন পরাশক্তি ঝাঁপিয়ে পড়েছে মিয়ানমারের উপর। রিয়ার আর্থ মিনারেল বা বিরল খনিজ, এই মুহূর্তে এটাই শক্তিধর দেশগুলির মধ্যে লড়াইয়ের ময়দান সৃষ্টি করছে। কেবলমাত্র চিনেই প্রায় ৮০ শতাংশ বিরল খনিজ পাওয়া যায়। মিয়ানমারের কচিন প্রদেশেও বিপুল মাত্রায় বিরল খনিজ পাওয়া যায়। চিন সে দেশের সামরিক জুন্টা সরকারকে সমর্থন ও সুরক্ষা দিয়ে অবাধে সেই খনিজ উত্তোলন করে চলেছে। এবারে সেই দিকে নজর পড়েছে ভারত ও আমেরিকার।
মিয়ানমারে দুটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করেছে। একটি কচিন প্রদেশে কচিন লিবারেশন আর্মি এবং অন্যটি রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে প্রাচীন লিবারেশন আর্মির সাথে চীনের দহরম মহরম বেশি আর আরাকানের সঙ্গে ভারতের। এই মুহূর্তে আমেরিকার টার্গেট আরাকান আর্মিকে নিজেদের অধীনে নিয়ে আসা। এর জন্য বাংলাদেশ থেকে করিডর তৈরির চেষ্টা করছে মার্কিন সেনা। বাংলাদেশের মুহাম্মদ ইউনূস সরকার এই ব্যাপারে সব ধরণের সাহায্য করছে। যা মোটেই পছন্দ করছে না ভারত ও চিন। যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট মিয়ানমারে প্রভাব বাড়িয়ে রিয়ার আর্থ মিনারেলের দখল নেওয়া। উল্লেখ্য, কচিন প্রদেশে দুটি খনি এই মুহূর্তে ভারতের নিয়ন্ত্রণে আছে, যেখান থেকে বিরল খনিজ উত্তোলন করে ভারত। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সিত্তেই বন্দর ভারতের দখলে পাশাপাশি সেখানে একটি মাল্টি মোডাল ইকোণমিক জোন তৈরি করেছে ভারত। যার মাধ্যমে ভারতের উত্তর পূর্বের সাতটি রাজ্য সরাসরি মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সিত্তেই বন্দরের সঙ্গে যুক্ত। অপরদিকে চিনরের তৈরি করা চিন মিয়ানমার ইকোণমিক করিডর এখন বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। অপরদিকে ভারতের জেমস বন্ড অজিত ডোভালের কুশলী চালে ভারতের কালাদান মাল্টি মোডাল প্রজেক্ট এখনও সুরক্ষিত।
স্কয়ান্ডিয়াম, ইট্রিয়াম, ল্যান্থানয়েড, ম্যাগনেট এরকম ১৭টি বিরল খনিজ বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিতে অপরিহার্য উপাদান। যা বৈদ্যুতিক এবং সেমি কনডাক্টর, লেজার বা অন্যান্য যুদ্ধস্ত্র তৈরির জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কক্সেসবাজার বা সেন্ট মার্টিন এর মত এলাকায় ঘাঁটি তৈরি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে মিয়ানমারকে নিয়ন্ত্রণ করতে। পাশাপাশি এই এলাকায় মার্কিন ঘাঁটি হলে বঙ্গোপসাগরেও মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বিস্তার পাবে। যা ভারত কোনভাবেই মেনে নেবে না। আর এই কারণে চীন ও রাশিয়া ভারতের পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। সেই কারণেই চট্টগ্রামকে ঘিরে বিশ্বের চার মহা শক্তিধর দেশ কার্যত সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর অন্যদিকে রাশিয়া চীন ও ভারত। মাঝখানে বাংলাদেশ দাবার গুটির মত ব্যবহৃত হচ্ছে।












Discussion about this post