গল্পের শুরুটা হয়েছিল দিন কয়েক আগে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করে বসেন ‘উপদেষ্টাদের অনেকেই সেফ এক্সিটের কথা ভাবতেছে’। এরপরই বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে নাহিদ ইসলামের এ বক্তব্যের ভিডিও ও ফটোকার্ড পোস্ট হতে শুরু করে। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয়ে যায় আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক। ভারতীয় গণমাধ্যমেও এটা নিয়ে চলছে নানান মুখরোচক খবর। এই বিতর্ক চলাকালীনই এনসিপির সংগঠক সারজিস আলম আরও এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি ছিল, কোথায় সেফ এক্সিট নেবেন আপনারা, মৃত্যুই হল একমাত্র এক্সিট! যা সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তোলে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, কারা কারা সেফ এক্সিট চাইছেন? কেনই বা চাইছেন?
গত বছর ৫ আগষ্টের পর যাই হোক নাহিদ ইসলামদের মতো ছাত্র নেতারাই অনেক ঝাড়াই বাছাই করে এই উপদেষ্টাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসকে ছাত্ররা রেড কার্পেট বিছিয়ে নিয়ে এসেছিলেন সুদূর ফ্রান্স থেকে। বাকি উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশ থেকে এসেছিলেন, কেউ আবার দেশেই ছিলেন। সেই সময় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব চেয়েছিল এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের খোলনলচে বদলে দেবে। মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন বটে, তবে সেটা উপরের দিকে নয়, নিচের দিকে। অর্থাৎ শেখ হাসিনার বাংলাদেশ আজ অধঃপতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে। যত দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৈনদশা ততই প্রকট হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে আবারও আওয়ামী লীগের বাড়বড়ন্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল আজ আর ঝটিকা নয়, বরং দিনক্ষন ঘোষণা করে হচ্ছে। আর সেই মিছিলে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হচ্ছেন রোজ। হাজারো চেষ্টা করেও আওয়ামী লীগকে দমানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও নিউইয়র্কে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন তার সরকার আওয়ামী লীগের উপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে। বলা হচ্ছে, এতেই কেঁপে গিয়েছে ছাত্রনেতা এবং উপদেষ্টামণ্ডলীর একটা বড় অংশ। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরে আসলে কী চলছে?
জুলাই বিপ্লবের মূল কাণ্ডারী হিসেবে প্রথমসারিতে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ওই সংগঠনের তরুণ নেতাদের কয়েকজন হাসিনা পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম নাহিদ ইসলাম। পরে তিনি উপদেষ্টা পদ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান হন। সেই নাহিদই এখন দাবি করছেন, উপদেষ্টাদের মধ্যে কয়েকজন সেফ এক্সিট খুঁজছেন, তাঁরা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন নিরাপদ প্রস্থানের জন্য। এর মধ্যেই গণঅধিকার পরিষদের নেতা রাশেদ খান দাবি করে বসেন, ৫ উপদেষ্টা নাকি শাখ হাসিনার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন সেফ এক্সিটের জন্য।
বাংলাদেশ এখন কার্যত দুটি সমান্তরাল মতবাদে বিভক্ত। একদল মনে করে এটা বিপ্লবের সরকার, ফলে দেশের একটা জোরালো সংস্কার করেই এই সরকার বিদায় নেবে। অন্যদল মনে করেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে দরকার একটা স্থায়ী ও স্থিতিশীল সরকার, আর সেটা সম্ভব অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে যে নির্বাচন হবে, সেটা আগেই ঘোষণা করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। সেই মতো আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন করানোর সবরকম প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর নির্বাচনের পর এমনিতেই সরে যেতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারকে। ফলে এখন থেকেই উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ সেফ এক্সিট খুঁজতে শুরু করেছেন বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তাঁদের মতে, এই সেফ এক্সিট মানে পালানো নয়, আসন্ন নির্বাচনে যাতে কোনও রাজনৈতিক দলের টিকিটে ভোটে লড়া যায় তাঁর নাম। আবার কেউ কেউ বলছেন, অনেকেই বিদেশ থেকে এসেছেন, তাঁদের একাধিক দেশের পাসপোর্ট রয়েছে। তাঁরাই আগে পালাবেন। যেমন রিজওয়ানা হাসান। নাহিদ ইসলাম কারও নাম না নিলেও উপদেষ্টা রিজওয়ানা আচমকা দাবি করেন, কারা ‘সেফ এক্সিট’ চাইছে, তা নাহিদ ইসলামকেই পরিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি একদম কোনও এক্সিট খুঁজছি না। দেশেই ছিলাম, বাকিটা জীবনও বাংলাদেশেই কাটাবো। অর্থাৎ, বোঝাই যাচ্ছে, নাহিদের ঢিল মৌচাকেই লেগেছে।












Discussion about this post