সিভিল আদালতে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার, সরকার-সেনা সম্পর্ক এবং সেনাবাহিনীতে এর প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে গোটা বাংলাদেশ এখন উত্তাল। শনিবার ১৪ কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেয়ার ঘটনার পর সেনাবাহিনীকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও আলোচনা চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যদিও সেনাবাহিনী একটি সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়ে দিয়েছে, আপাতত ওই ১৪ কর্মকর্তাকে নিজেদের হেফাজতেই রাখা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হল, আগামী ২২ অক্টোবর গ্রেফতার দেখিয়ে ওই সেনাকর্তাদের ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে হাজির করানো হবে কি না। যা নিয়ে নাকি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অন্দরেই চলছে ব্যাপক টানাপোড়েন। যদিও বাংলাদেশের ইতিহাসে একযোগে এতজন সেনা কর্মকর্তাকে সিভিল আদালতে বিচারের ঘটনা একেবারেই বিরল। জানা যাচ্ছে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী যেমন আড়াআড়ি বিভক্ত হয়ে গিয়েছে, তেমনই সাবেক সেনাকর্তারাও দ্বিধাবিভক্ত। এও জানা যাচ্ছে, সাবেক সেনাকর্তাদের একটা বড় অংশ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছেন।
বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ইতিহাসে বহুবার অভ্যুত্থান ঘটেছে। এবার অবশ্য গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে, কিন্তু তাতেও সেনাবাহিনীর একটা বড় ভূমিকা ছিল। কারণ, শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের পক্ষ নিয়ে দমনমূলক প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে বলেই দাবি। যার জেরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন খুব সহজেই ঘটে গিয়েছিল গত বছরের ৫ আগস্ট। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান সেদিনই সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে দাবি করেছিলেন তিনিই এখন থেকে দেশবাসীর সুরক্ষা ও আকাঙ্খার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। এবং ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বিগত ১৫ মাসে তিনি তাঁর কোনও কথাই রাখতে পারেননি। বাংলাদেশে যখন ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপর আক্রমণ, অত্যাচার হয়েছে, সেনাপ্রধান তা দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন। নির্বাচন নিয়ে ক্রমাগত গড়িমসি করে গিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাপ্রধান এখানেও চুপ করে ছিলেন। এবার তিনি নিজেই ফাঁদে পড়েছেন। কারণ ইউনূস সরকার শেখ হাসিনার সঙ্গে গুম-খুনের মামলায় এবার কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত ২৪ জন সেনাকর্তার বিরুদ্ধেও মামলা ঠুকে দিয়েছে। আর তা করা হয়েছে রীতিমতো আঁটঘাঁট বেঁধেই। যা নিয়ে চরম বিব্রত জেনারেল ওয়াকার। তাঁর হাতে আর মাত্র কয়েকদিন, ওই সেনাকর্তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিলে তাঁদের বিচার হবে সিভিল আদালতেই। কিন্তু বাংলাদেশে একটা সেনা আইন আছে, যেখানে স্পষ্ট বলা আছে সেনাবাহিনীর কেউ যদি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে তাহলে তদন্ত ও বিচার হবে সেনাবাহিনীর নিজস্ব আইনে। এই বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং শেখ হাসিনাই।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব বরাবরই। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন দাবি তুলে একদল অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সাবেক সেনাকর্তাদের ওই আবেদন পর্যালোচনা ও যথাযথ সুপারিশের জন্য ৯ সদস্যের কমিটিও গঠন করেছিল ইউনূস সরকার। এও জানানো হয়েছিল, ওই কমিটি অনধিক দুই মাসের মধ্যে প্রাপ্ত প্রতিটি আবেদন পর্যালোচনা করে যথাবিহিত বিধিসম্মত সুপারিশ প্রণয়ন করবে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ কমিটিকে প্রয়োজনীয় সব ধরণের সহায়তা দেবে বলেও জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিভক্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা অনেক আগে থেকেই ছিল। একদল যারা জামাতপন্থী, তাঁরা ভিতর থেকে বাহিনীকে দুর্বল করতে চাইছে এবং ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চাইছেন। অন্যদল সেনাবাহিনীর আস্থা ও মর্যাদা তুলে ধরতে চাইলে তাঁদের আওয়ামী লীগ বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। এবারও অনেকটা তাই ঘটেছে। ফলে সাবেক সেনাকর্তাদের একটা বড় অংশ এবার জেনারেল ওয়াকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে উদ্যোগী হয়েছেন বলেই সূত্রের খবর। তাঁরা সেই সমস্ত কর্মরত সেনাকর্তাদের পাশে রয়েছেন যারা এই গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে ক্ষুব্ধ। ফলে বাংলাদেশ সেনার অভ্যন্তরে এবং বাহিরে চলছে নানা আয়োজন।












Discussion about this post