বাংলাদেশে গুম সংক্রান্ত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ১৫ জন্য কর্মরত অফিসার-সহ মোট ২৫ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। বাংলাদেশের ইতিহাসে একযোগে এতজন সেনা কর্মকর্তাকে সিভিল আদালতে বিচারের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। সিভিল আদালতে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার পর্ব ঘিরে সরকার-সেনা সম্পর্ক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এর প্রভাব কেমন হতে পারে তা নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কারণ, আচমকাই বাংলাদেশ সেনার পক্ষ থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে একটা ব্যাখ্যা দওয়া হয়েছে। ফলে এই কৌতুহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যারা সেনাবাহিনীর সাংবাদিক সম্মেলন খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা বুঝবেন এর গভীরতা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হাকিমুজ্জামান ঢাকার সামরিক সদর দফতরে ওই সাংবাদিক সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, একজন কর্মকর্তা ছাড়া বাকি ১৪ জনই সেনা সদরে রিপোর্ট করেছেন। তাঁদের সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি কিন্তু একবারও বলেননি ওই ১৪ জন সামরিক কর্তাকে গ্রেফতার বা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি এও দাবি করেছেন, তাঁদের হাতে কোনও ওয়ারেন্ট এসে পৌঁছয়নি। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দেখেই আমরা ওই আধিকারিকদের সেনা সদরে রিপোর্ট করতে বলেছিলাম।
এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করার মতো। প্রথমটি হল সোশ্যাল মিডিয়া দেখে সেনাবাহিনী অ্যাকশন নিয়েছে এবং দ্বিতীয়টি হল যে কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি তিনি হলেন মেজর জেনারেল কবির আহমেদ। যিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কেন এই দুটি তথ্য তাৎপর্যপূর্ণ? কারণ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যে কিছু ঘটছে সেটা প্রথম দাবি করেছিলেন ফ্রান্সে বসে থাকা বাংলাদেশি ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য। তিনিই ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছিলেন, ৪৬ পদাতিক বাহিনী নাকি বিক্ষুব্ধ হয়েছে, বিদ্রোহ করতে পারে। এই দাবি করে তিনি বাংলাদেশের ছাত্রদের আহ্বান করেন রাস্তায় নেমে আসার জন্য। মনে করা হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদেশ থেকে এই ধরণের উস্কানির ফলে যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না হয় তাই তড়িঘড়ি সাংবাদিক সম্মেলন। অন্যদিকে, একমাত্র শেখ হাসিনার সামরিক সচিব আত্মগোপনে চলে যাওয়াও খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে বিগত ১৫ মাস ধরে যে অব্যবস্থা চলছে, এই ঘটনা তারই চুরান্ত রূপ। এখান থেকেই ঘটনাপ্রবাহ অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। ১৪ জন কর্মরত সামরিক অফিসারকে সেনাবাহিনী নিজেদের হেফাজতে রেখেছে। আগামী ২২ অক্টোবর তাঁদের আদালতে হাজির করানোর কথা। কিন্তু সেনা কর্মকর্তাদের বিচার সিভিল আদালতে করা নিয়ে যে ধরণের বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ সেনার অভ্যন্তরে। তারমধ্যে একটা বড় অংশ ক্ষুব্ধ। এমনকি সেনাবাহিনীকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের গুজব,আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে সোশ্য়াল মিডিয়ায়। মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। যিনি নিজেও এই একই মামলায় সহ-অভিযুক্ত। এক অডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন মুহাম্মদ ইউনূসের অপশাসনের চুরান্ত নিদর্শন হল বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও সিভিল প্রসাশনের বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্ৰেফতারি পরোয়ানা।
সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়না জারি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি কৌশলী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে আর অন্যরা অনেকেই এ বিষয়ে চুপ থাকার কৌশল নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, আগামী কয়েকদিনে এ ঘটনার গতি প্রকৃতি আরও পরিষ্কার হবে। মূলত এরপরই চূড়ান্তভাবে এসব কর্মকর্তার বিষয়ে সেনাবাহিনীর মনোভাব পরিষ্কার হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, এ ঘটনাটি যেভাবে জনসম্মুখে প্রচার করা হয়েছে, তাতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনীর সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেখা যেতে পারে। আর এটাই মেনে নিতে পারছেন না বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ। ফলে ঘটনা যে কোনও সময় অন্যদিকে মোড় নিতে পারে।












Discussion about this post