হিন্দিতে একটি কথা আছে – আকালমন্দ কে লিয়ে ইশারা কাফি হ্যায়।
কেন এটা বলা হল, তার জন্য যেতে হবে চলতি বছর গোড়ার দিকে। বাংলাদেশের জাতীয় শহিদ দিবসে সেনাপ্রধান ওয়াকার তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বাহিনী একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ শক্তি। আমাদের শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে চলতে হবে। বাহিনীর মধ্যে যেন কোনও গোষ্ঠী তৈরি না হয়। আমরা এক এবং ঐক্যবদ্ধ।’ সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য আগামীদিনে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মধ্যে দিয়ে দেশের সেবা করবে এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত থাকবে।’ এখানেই শেষ নয়, সেনাপ্রধানকে এও বলতে শোনা যায়, ‘যে নৈরাজ্য চোখের সামনে আমরা দেখছি, সেই নৈরাজ্য আমাদের তৈরি।’
সেনাপ্রধানের সেদিনের দেওয়া ভাষণে আরও একটি বিষয় বেশ লক্ষ্য করার মতো। জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ‘বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমখুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠছে। এই সব ঘটনার সঙ্গে বাহিনীর যাঁরা জড়িত তাঁরা তাঁদের দায় কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন না। কিন্তু এত কিছু বিতর্কের পরেও প্রশাসনের সঙ্গে যারা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যেমন পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টিলিজ্যান্স, ন্যাশনাল সিকিউরিট ইন্টেলিজ্যান্স দায়িত্বের সঙ্গে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে। আগামীদিনেও করবে।’
শুরুতেই কেন বলা হয়েছে ‘আকালমন্দ কে লিয়ে ইশারা কাফি হ্যায়’ এবার হয়তো বোঝা গেল। সেনাপ্রধান কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, ‘বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমখুন, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এবং এর সঙ্গে বাহিনীর যে সব কর্মকর্তা জড়িত, তাঁরা কাঁধ থেকে তাদের দায় ঝেড়ে ফেলতে পারেন না।’ প্রশ্ন উঠছে, তাহলে তখন থেকেই কি সেনাপ্রধান ওয়াকার তাঁদের জন্য নীল নকশা তৈরি করে রেখেছিলেন যাঁরা এই সব হত্যাকাণ্ডের জড়িদের তিনি বিচারের আওতায় নিয়ে আসবেন। আরও একটা বিষয় বেশ লক্ষ্য করার মতো। ঘটনাটি ঘটল এমন একটি সময়, যখন প্রায় এটা নিশ্চিত যে হাসিনা ক্ষমতায় ফিরছেন। আর ইউনূসের বিদায় আসন্ন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনা। দেশটিতে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। বাহিনী তাদের পছন্দের লোককে ক্ষমতায় বসিয়ে পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছেন। আবার যখন তাদের মনে হয়েছে ছাউনিতে ফিরে যাওয়ার তখন তারা ছাউনিতে ফিরে গিয়েছেন। কিন্তু একসঙ্গে বাহিনীর এতজন সদস্যকে বিচারের আওতায় আনার ঘটনা এই প্রথম ঘটল। এদের মধ্যে আবার বেশ কয়েকজন বাহিনীর কর্মরত সেনা সদস্যও আছেন। তাঁদের সংখ্যাটা খুব একটা কম নয়। লক্ষ্য করার মতো আরও একটি বিষয় হল, এদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনালে। তার একটি ধারার আবার সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত ধারায় বলা হয়েছে, চার্জশিট দাখিল করা মাত্র তারা আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, কোনও স্বশাসিত এবং আধা সরকারি সংস্থার কোনও পদে থাকতে পারবেন না। এছাড়া চাকুরিজীবী হলে তিনি তাদের বরখাস্ত হতে হবে।
আর সেনাকর্তাদের গ্রেফতারের ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট রীতিমতো বিভক্ত। কোনও কোনও প্রান্ত থেকে বলা হয়েছে, বাহিনীতে দুইভাগে বিভক্ত। কোনও কোনও প্রান্ত থেকে সংখ্যাটা তিন থেকে চার। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট যে গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পিছনে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদত ছিল, আগামীদিনেও বাংলাদেশের বুকে যে পালাবদল ঘটবে, সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সেনাই নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে।












Discussion about this post