বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অন্দরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীর ২৪ জন সেনাকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তারা মানবতা বিরোধী অভিযোগে অভিযুক্ত। এই ২৪ জন সেনাকর্তার মধ্যে ১৩ জন কর্মরত। একসঙ্গে এতজন সেনা কর্তার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আগে কখনও ওঠেনি। তাদের বিচার সেনা আইনে হবে নাকি ফৌজদারি আইনে তা নিয়ে প্রবল চাপে পড়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। এমনকি বিচার সেনা আইন বা ফৌজদারি আইনে হবে কিনা, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা উঠে এসেছে। যদিও এই প্রশ্নের উত্তরে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে হবে। সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত এই আইনের অধীনে সেনাবাহিনী র্যানব, পুলিস সহ সবধরনের শৃঙ্খলা বাহিনীর বিচার করার এক্তিয়ার রয়েছে। অর্থাৎ তারা কর্মরত থাকলেও সাধারণ কোনও আইনে নয় বা সেনা আইনে নয়, ট্রাইব্যুনালের আইনেই তাদের বিচার হবে। যেভাবে সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তাতে সেনা অভ্যুত্থানের সম্ভাবনার কথা উঠে আসছে। এরইমধ্যে এই মাসে ভারত সফরে আসার কথা ছিল সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের। কিন্তু সেটি হয়নি। এর পাশাপাশি সৌদি আরবে অত্যন্ত একটি গুরুত্বপুর্ণ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা ছিল ওয়াকারের। সেটিও বাতিল হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি যে কতটা গুরুতর, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি সিদ্ধান্ততেই বেসামাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পাশাপাশি অনেকে বলছেন, প্রায় ধ্বংসের মুখে হাসিনার আমলের সেনাকর্তারা। কারণ যাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, তারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের সেনাকর্তা।
এদিকে রবিবার ঢাকার বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে প্রকাশিত ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ঢাকা সেনানিবাসের বাশার রোড সংলগ্ন উত্তর দিকে অবস্থিত এমইএস বিল্ডিং নম্বর ৫৪-কে সাময়িক ভাবে কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বার্ধীন অন্তবর্তীকালীন সরকার। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এই আদেশ জারি করা হল বলে জানান হয়। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে ওই অস্থায়ী কারাগারে কোন বন্দিদের রাখা হবে, সেই বিষয়ে সরকারি নির্দেশিকায় কিছু বলা হয়নি। এদিকে পরিস্থিতি জটিল হতেই সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে একটি বৈঠক করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, কর্মরত সেনা আধিকারিকদের চাকরি থেকে বসিয়ে দেওয়া হলেসেনাপ্রধানকে এই বিষয়ে পদক্ষেপ করতে হবে। তাতে সুপারিশ মেনে রায় দেবেন রাষ্ট্রপতি। সেনাকর্তাদের অভিযুক্ত করার পিছনে সেনাপ্রধানের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ। এদিকে সরকারি সিদ্ধান্ত অস্বস্তিতে পড়েছেন জেনারেল ওয়াকার। কারণ চলতি সপ্তাহের আগে ট্রাইব্যুনালের আইনে অভিযুক্তদের চাকরি থেকে বসিয়ে দেওয়ার কোনও বিধান ছিল না। এখন ১৩ জন সেনা আধিকারিকে বরখাস্ত করতে হলে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনও মামলায় একসঙ্গে এতজন সেনাকর্তা অভিযুক্ত হননি বলে খবর।
এদিকে আবার প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে কেন অভিযুক্ত সেনাকর্তাদের বিরুদ্ধে বাহিনী ব্যবস্থা নেয়নি? কেন সেনাপ্রধান হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন? প্রসঙ্গত, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসন আমলে বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর। এদিকে গত বছর ৫ই অগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়েছেন গুমের শিকার ব্যক্তিরা। তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যরিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম, আব্দুল্লাহিল আমন আজমি সহ আরও অনেকে। তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গুমের দুই মামলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এমনকি ১৫ই সেপ্টেম্বর গুমের তদন্তে গুম কমিশন গঠন করে অন্তবর্তীকালীন সরকার। ২৬ সেপ্টেম্বর কমিশন ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ের ভিতরে জয়েন্ট ইন্ট্রাগোরেশন সেল পরিদর্শন করে। তখন মেজর জেনারেল মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান ডিজিএফআই-এর মহা পরিচালক ছিলেন। পরে ১৭ ই অক্টোবর তাকে বদলি করা হয়। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ই অগাস্টের পর ডিজিএফআইয়ের সদর দফতরে ইন্ট্রাগারেশন সেলে আংশিক পরিবর্তন করা হয়েছে। দেওয়ালে রং করা হয়েছে। যেখানে বন্দীরা অনেক কিছু লিখেছে বলে সাক্ষ্য দিয়েছে। কিছু প্রমাণ আমাদের পরিদর্শনের আগের দিনই নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও সেনাবাহিনীর উপর এমন অ্যাকশনের পর কি পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটাই দেখার।












Discussion about this post