বছর ঘুরলেই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। তদারকি সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূসের বয়ান সে কথাই বলছে। কিছুদিন আগে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন তাঁর সরকার আসন্ন ভোট অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে কতটা তৎপর। গোল বেধেছে অন্য জায়গায়। যাঁরা একসময় ইউনূসের মিত্র ছিল যেমন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি তারা এখন বেসুরে গান গাইতে শুরু করেছে। সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাদের কথাবার্তা শুনে মধুকবি মাইকেলে বিখ্যাত কবিতা ‘বীরাঙ্গনার’ একটি লাইন মনে করায় – ‘একী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে’ !
সত্যি তো আচমকা এরা বেসুরে গান গাইছে। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেই পুরনো প্রবাদটি ভুলে গেলে কী করে হবে – রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু হয় না। গোলটা বাঁধল কোথায়? সম্প্রতি বিএনপি নীতি নির্ধারণ কমিটি বৈঠকে বসে। সেই বৈঠকে দলের সদস্যরা বর্তমান ইউনূস সরকারের ময়নাতদন্ত করে। তাদের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বলছে, সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার আচার আচরণ একেবারেই নিরপেক্ষ নয়। গণ অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে এমন কয়েকজনকে বসানো হয়েছে যারা বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। এমনকী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে তদারকি সরকার যাদের নিয়োগ করেছে, তাঁরাও বিশেষ একটি দলের খুব প্রিয়পাত্র। গোল বাঁধার আরও কারণ রয়েছে। এরা চেয়েছিল আগে সংস্কার পরে ভোট। আর ভোট হবে জুলাই সনদের ওপর ভিত্তি করে। এমনকী পিআর পদ্ধতি নিয়ে এদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। উচ্চকক্ষে পিআরের পক্ষে জামায়াত এনসিপিসহ ২৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত হলেও এতে, ভিন্নমত রয়েছে বিএনপিসহ ৭টি রাজনৈতিক দল ও জোটের।
মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে ভোটের সময় নিয়েও। বিএনপি চেয়েছিল, বলা ভাল, দাবি করেছিল ভোট হোক ডিসেম্বরে। এই ব্যাপারে সেনাবাহিনী সহমত পোষণ করে। কিন্তু তাদের দাবিকে অস্বীকার করে ইউনূস সরকার জানিয়ে দেয় ভোট হবে ফেব্রুয়ারিতে। যদিও লন্ডন সফরকালে ইউনূস তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পরেই কিন্তু ইউনূস ভোটের সময় ঘোষণা করেন। সমস্যা অন্য জায়গায়। এই সরকার যে সব দিক থেকে ব্যর্থ, সেটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। এই সরকারের আমলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূডা়ন্ত অবনতি হয়েছে। গত এক বছরে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ মান ইজ্জত সব গিয়েছে। সরকার মুখে বলছে, ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু করতে তারা বদ্ধপরিকর। কিন্তু যে সরকার খুব ছোটখাটো ঘটনা সামাল দিতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে যাচ্ছে, সেই সরকারের পক্ষে ভোটে অশান্তি হলে সেটা প্রতিহত করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এই তিন দলের প্রধান শত্রু কিন্তু আওয়ামী লিগ। সম্প্রতি বিবিসি একটি সমীক্ষা চালায়। সেই সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, অতীতের থেকে আরও বেশি আসন তারা দখল করতে চলেছে। জামায়াত নেতা সৈয়দ আবদুল্লা মহম্মদ তাহের তো ইউনূসকে হুঁসিয়ারি দিয়েছেন। বলেছেন, ‘প্রশাসনিক স্তরে যে ষড়যন্ত্র চলছে সেটা অবিলম্বে বন্ধ করুন।’ হুঁশিয়ারি এসেছে বিএনপির তরফ থেকে। দলের তরফ থেকে বলা হয়েছে, তদারকি সরকার যেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ‘আমরা চাই উনি (ইউনূস) সেনার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখুক।’ বিএনপি সারসত্য বুঝে গিয়েছে। বাহিনী যদি কোনও কারণে বেঁকে বসে, তাহলে আম আর ছালা দুটোই যাবে।












Discussion about this post