ভারতে বসে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা -কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তিতা দেওয়া এমনকি বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে তার দলীয় কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষা করা ডঃ মহম্মদ ইউনুসের কাছে ক্ষোভ, বিরক্তি ও উদ্বেগের কারণ। এ বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মহম্মদ ইউনুস বলেছেন, ভারতে বসে হাসিনার এইসব কার্যকলাপ ভারত কেন বন্ধ করছে না। এমনকি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস সরাসরি মোদীর বিষয়ে অভিযোগ তুলে বলেন, তিনি যখন মোদীকে অনুরোধ করেছিলেন হাসিনার ভারতে বসে এই কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য তখন মোদী এর উত্তরে বলেছিলেন হাসিনা ভারতের অতিথি। তার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। ভারতের যোগাযোগ মাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীন। এই অবস্থায় ভারত সরকার শেখ হাসিনার মুখ বন্ধ করতে কোন পদক্ষেপ নেবে না।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার নানান ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যেমন, শেখ হাসিনা যাতে তার দলীয় কর্মীদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে তাই যোগাযোগের অ্যাপগুলি যেমন টেলিগ্রাম, সিগন্যাল এই অ্যাপগুলোর স্পিড কমিয়ে রাখা হবে। ২০২৪ এর ৫ ই আগস্টের পর শেখ হাসিনাকে সরাসরি কোন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যায়নি। তারপর এই প্রথম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলিকে সাক্ষাৎকার দেওয়া শুরু করেছেন হাসিনা।
গত মঙ্গলবার রাতে হাসিনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। যে খবরে বলা হয় বঙ্গবন্ধু কন্যা তথা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যু হয়েছে। তাকে ভর্তি করা হয়েছিল দিল্লির একটি সামরিক হাসপাতালে। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেই খবরে সিলমোহর বসায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্যাডের আদলে একটি কাগজ ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওয়াবাদুল কাদেরের সই করা একটি শোকবার্তা। ফলে তোলপাড় হয়ে ওঠে গোটা বিশ্ব।
এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরে দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে পালটা বিবৃতি জারি করে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই বার্তা ভূয়ো। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তথা অন্যতম শীর্ষনেতা একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শেখ হাসিনার মৃত্যু বা অসুস্থতা নিয়ে যে ধরনের তথ্য ছড়ানো হচ্ছে সেটি গুজব। এটি করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। এর উদ্দেশ্য দলের নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। হাসিনার একটি অডিও বার্তা ও আপলোড করা হয়। সেখানে হাসিনাকে বলতে শোনা যায় আমার নামে একটি মিথ্য প্রচার চলছে। আমি অসুস্থ হতে যাব কেন ? আমি সু্স্থ আছি। আমাকে তো আমার দেশকে উদ্ধার করতে হবে।
এই বিবৃতির ঠিক পরের দিন বিশ্বের প্রথম সারির দুটি গণমাধ্যম হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। দুটি গণমাধ্যমেরই শিরোনাম এক। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এবং ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কে আলাদা আলাদা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা নিয়ে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানে বিরত থাকলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শামিল হবেন না।
গত বুধবার এই সাক্ষাৎকার গুলি যে সাংবাদিকরা নিয়েছেন তারা নিজেদের নাম দিয়ে বাই লাইন রিপোর্ট চাপিয়েছেন। অর্থাৎ এই সাক্ষাৎকারটিকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। অন্যদিকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট হাসিনার এই সাক্ষাৎকারটিকে রেয়ার ইন্টারভিউ বা দুর্লভ সাক্ষাৎকার হিসেবে অভিহিত করেছেন। রয়টার্স হল বিশ্বব্যাপি প্রতিষ্ঠিত সংবাদ সংস্থা। তাদের খবর সমস্ত দেশের গণমাধ্যম গ্রহণ করে। ফলে রয়টার্সে দেওয়া শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রচার হতে সময় লাগেনি। বিশ্বের বহু দেশের বহু নামী-দামী সংবাদমাধ্যম মুহূর্তে সেই খবর প্রকাশ করেছে। যা মুহাম্মদ ইউনূসের উপর নিঃসন্দেহে চাপ সৃষ্টি করবে।
এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে হাসিনা ইউনুস সরকারকে এমন একটা পরিস্থিতিতে ফেলেছে যাতে তারা বুঝতে পারছে শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য সাবেক শাসকে পরিণত করা যায়নি। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ জুড়ে তার বিরুদ্ধে নানান ধরনের প্রচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে সেখানে সাক্ষী হাজির করে তার মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও ইউনুস সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি আন্তর্জাতিক পরিসরে শেখ হাসিনা অত্যাচারী শাসক হিসেবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবেন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলি তার সাক্ষাৎকার নিতে অস্বীকার জানাবে। কিন্তু হল ঠিক এর উল্টোটা।
কূটনৈতিক মহলের বক্তব্য, শেখ হাসিনাকে এবার স্বমহিমায় বাংলাদেশে ফেরানোর তোড়জোড় শুরু করে দিল নয়া দিল্লি। তারই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলিতে তার মুখ খোলার রাস্তা করে দেওয়া। যাতে আওয়ামী নেত্রী আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের বক্তব্য ও অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।












Discussion about this post