জাকির নায়েক। যিনি একজন চিকিৎসক। যিনি বিশ্বে ইসলামিক ধর্মের একজন অনুপ্রেরণা ছিলেন। তিনিই আবার পলাতক আসামী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদে উস্কানি, হাজার কোটি টাকা অর্থ পাচারের। এই বিতর্কিত ধর্ম প্রচারক জাকির নায়েকে এক মাসের জন্য অতিথি হিসাবে বরণ করে নিতে চলেছে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার। একসময় জাকির নায়েকের কারণে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছিল পিস টিভির সম্প্রচার। তাঁকে সাদরে দেশে ফেরাতে চলেছেন মুহাম্মদ ইউনূস সরকার। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে অন্তবর্তী সরকারকে বিপদে ফেলেছে। যা সিদ্ধান্তই নেবে, তাতেই তারা বিপদে পড়বে। যেটা ভারতের পরিকল্পনা। বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
একসময় জাকির নায়েক পিস টিভিতে বক্তব্য রাখতেন। তিনি মূলত ধর্ম নিয়ে বক্তৃতা দিতেন। তাঁর বক্তব্যে নানা বিতর্ক ছড়িয়েছে। তিনি সরাসরি ধর্ম বিষয়ে উস্কানি দিতেন বলে অভিযোগ। ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান ঘটে যায়। যা দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা বিশ্ব। তদন্তে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর বিষয়। হামলাকারী জঙ্গিদের কয়েকজন নাকি নিয়মিত জাকির নায়েকের বক্তব্য শুনতেন। এবং তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হতেন। এরপর ব্যবস্থা নেয় তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার। সঙ্গে সঙ্গেই পিস টিভি নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সময় জাকির নায়েকের বিষয়ে খর্বহস্ত হয় ভারত। তাঁর সংস্থা আই আর এফ-কে সন্ত্রাসবাদের মদত দেওয়ার অভিযোগে ভারতের কুখ্যাত ইউ এ পি এ বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধে আইনের অধীনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো এবং বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা তৈরি এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের মত অভিযোগে তদন্ত করে ভারতের তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। কিন্তু তার আগেই ২০১৬ সালে ভারত ছেড়ে চলে যান জাকির নায়েক। আশ্রয় নেন মালেশিয়ায়। যেখানে তৎকালীন সরকার স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেয়। ভারত সরকার তাকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য মালেশিয়া সরকারের কাছে অনুমতি জানিয়েছিল। তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির চেষ্টাও করা হয়েছে একাধিকবার। এখন সেই জাকির নায়েক আসতে চলেছে বাংলাদেশে।
এদিকে গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে। বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসেছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তবর্তী সরকার ২৮ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক মাস ব্যাপী দেশে সফর করার অনুমতি দিয়েছে তাঁকে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে ভারত নিজেদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসাবে দেখছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর এক সম্মেলনে তারা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয়, যে জাকির নায়েক একজন পলাতক এবং ভারতের ওয়ান্টেড।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হঠাৎ করে জাকির নায়েককে কেন অনুমতি দিল দেশ সফরের? আর দিলেও এতে ভারতের মাথাব্যথা কেন? অনেকে বলছেন যেহেতু জাকির নায়েক একজন শুধুমাত্র ধর্মপ্রাণ মানুষ নন, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক গুরতর অভিযোগ রয়েছে এবং তিনি সন্ত্রাসবাদে মদত দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে, সেই কারণে ভারতের মাথাব্যথা। তিনি ফের বাংলাদেশে এসে ধর্মের নামে উস্কানি দিতে থাকবেন। তাতে শুধু বাংলাদেশ বিশৃঙ্খলায় পড়বে না। এতে করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে ভারতেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে ভারতের চাপে পড়ে তাঁর সফর বাতিল করে দেওয়াতে বাংলাদেশ সরকারের হাতে খুব বেশি দরজা খোলা নেই। ভারতের কাছে নতিস্বীকার করে জাকির নায়ককে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া। এমনটা করলে বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে। দেশের ভিতরে তীব্র জনরোষ তৈরি হতে পারে। এমনকি জাকির নায়েকের সফর বাতি করে দিলে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের দূর্বল মেরুদণ্ডের পরিচয় পাবে গোটা দেশবাসী। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার যদি জাকির নায়েকের উপর কঠর নজর রাখে, সেটিও কঠিন সরকারের জন্য। তার কারণ জাকির নায়েকের যে কোনও বেফাঁস মন্তব্যই দুই দেশের মধ্যএ জটিলতা নিয়ে আসতে পারে। ফলে যে পন্থায় বেছে নিক না কেন বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার, সেটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।












Discussion about this post