বাংলাদেশে সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত কয়েকমাস ধরে দফায় দফায় আলোচনা করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। কিন্তু তারপরও মৌলিক অনেক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থেকে গিয়েছে। যদিও গত ১৭ অক্টোবর ঘটা করে জুলাই সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। তাতে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী-সহ ২৫টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষরও করেছে। একমাত্র এনসিপি তাতে স্বাক্ষর করেনি।
মজার বিষয় হল, বাংলাদেশের ঐক্যমত কমিশন দাবি করছে, কয়েক দফার আলোচনার পর বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে দেখা যাচ্ছে, এখনও আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল বা এনসিসি গঠন-সহ বেশ কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা মতবিরোধ রয়ে গিয়েছে। দেখা গিয়েছিল, জামায়তে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি প্রথম থেকেই এই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে গড়িমসি করছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জামাত স্বাক্ষর করলেও করেনি এনসিপি। তবে বিএনপি স্বাক্ষর করেছে হাসিমুখেই। এই আবহেই প্রশ্ন উঠছে, বিএনপি কি বড্ড ভুল করে ফেলল এই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে? এই প্রশ্ন আরও উস্কে দিয়েছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি ২৯ অক্টোবর ঢাকার বাংলামোটরে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া না দেখেই স্বাক্ষর করে বিএনপি ভুল করেছে।
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এখন কার্যত মল্লযুদ্ধ শুরু হয়েছে গণভোট আগে হবে না কি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে হবে তা নিয়ে। কারণ এরমধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং বাম ঘরানার চারটি রাজনৈতিক দল এই আয়োজনে অংশ না নেওয়ায় বিষয়টি নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিএনপি প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাড়াহুরো করছে নির্বাচনকে যেনতেন প্রকারেণ দ্রুত করতে। এটা তাঁদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা হতেই পারে, কারণ এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ নেই। ফলে তাঁরা মনে করছে, ভোট হলেই তাঁরা সরকার গঠন করবে। তাই হয়তো তড়িঘড়ি জুলাই সনদে সই করে দেয় বিএনপি। কিন্তু তাঁরা ভাবেনি এর পরিণতি কি হতে পারে।
যদিও জুলাই সনদের বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু এনসিপি বিতর্ক আরও উস্কে দিল। যদিও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আরও বিস্ফোরক দাবি করে সেই বিতর্কের মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, জুলাই সনদে বিএনপির স্বাক্ষরিত কোনও পাতা নেই। অন্য পাতা সেখানে যুক্ত করে জমা দেওয়া হয়েছে। রিজভীর কথায়, এটা খুবই দুঃখজনক ও প্রতারণামূলক কাজ। জনগণের সঙ্গে এমন প্রতারণা চলতে পারে না।
সবমিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের একটা বড় অংশ দাবি করছেন, ‘বিএনপি ধরা খেয়ে যাচ্ছে’। তাঁদের বক্তব্য, এখন সেটা বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে। জুলাই সনদে সই মানেই বিএনপির আত্মসমর্পণ। কেবল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র বদলে দেওয়ার একটি চুক্তি। যে দল একসময় সংবিধান রক্ষার কথা বলত, আজ সেই দলই সংবিধানের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাল্টানোর ষড়যন্ত্রে নামছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিএনপি এখন বুঝতে পারছে, এই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার পর তাঁদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বসেছে। বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মানুষ মনে করছেন, বিএনপি কেবলমাত্র আওয়ামী লীগকে দূরে সরিয়ে ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বড্ড ভুল করে ফেলল। এথন যাই বলুক, আগামীদিনে তাঁদের কপালে দুঃখ আছে।












Discussion about this post