ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইসলামি বক্তা জাকির নায়েককে আপাতত বাংলাদেশে আসার অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিষয়টা নিয়ে কূটনৈতিক মহল ভারতের জয় দেখছেন। কেন ভারতের জয়? সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট যুক্তিও সাজিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
২০১২ সালে জ়াকির নায়েকের এক বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের জেরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর রুজু হয়েছিল। এরপরে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা হয়। সেই ঘটনাতেও জাকিরের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ দানা বাধে। ওই ঘটনার পর পরই ভারত থেকে পালিয়ে যান ইসলামী ধর্ম প্রচারক জাকির। তাঁকে পলাতক ঘোষণা করে ভারত সরকার। ভারত থেকে পালিয়ে মালয়েশিয়ায় চলে যান বলেই খবর। এখনও ভারত ওই ব্যক্তিকে ভারতে নিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে নয়া দিল্লি। এরমধ্যেই বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় জাকির নায়েক ঢাকা যাচ্ছেন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের দাবি, বাংলাদেশেরই এক প্রতিষ্ঠান আগামী ২৮-২৯ নভেম্বর দু’দিনের জন্য তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসতে চাইছে। তাঁরা বড় মাপের কর্মসূচি নিয়েছে, এমনকি জাকিরকে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রান্তেও নিয়ে গিয়ে বক্তৃতা করানোর পরিকল্পনা রয়েছে ওই ইসলামিক সংগঠনের। এটা জানাজানি হতেই নড়েচড়ে বসে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। এমনকি ভারতেও জাকিরের ঢাকা সফর ঘিরে জল্পনা শুরু হয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রকের সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে এ বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জাকিরের সফর নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে দিল্লি কোনও বার্তা দিতে চায় কি না। জবাবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন নয়া দিল্লির অবস্থান। কূটনৈতিক ভাষায় তিনি বলেন, জাকির একজন পলাতক। ভারত তাঁর খোঁজ চালাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি আরও জানান, তাই জ়াকির যেখানেই যান না কেন, সেখানকার কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ করবেন বলেই ভারতের আশা। জ়াকির প্রসঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে উদ্বেগের বিষয়গুলি রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট দেশ পূরণ করবে বলেও মনে করে দিল্লি। অর্থাৎ জাকির প্রসঙ্গে ভারত ঘুরিয়ে বাংলাদেশের ঘাড়েই বন্দুক রেখে দিল। মজার বিষয় হল, ভারতের ওই বার্তার এক সপ্তাহ কাটার আগেই জানা গেল, জ়াকিরকে এখনই বাংলাদেশ সফরের অনুমতি দিচ্ছে না মুহাম্মদ ইউনূসদের অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, সম্প্রতি একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়, সেখানেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দাবি, এই বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হয়, জাকির নায়েক বাংলাদেশে এলে প্রচুর জনসমাগম হবে। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে প্রচুর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের প্রয়োজন হবে। জাকির নায়কের ঢাকায় আসাকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে এত বাহিনী মোতায়েনের সুযোগ নেই। সবাই এখন নির্বাচনমুখী। তাই ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, জাতীয় নির্বাচনের পর জাকির নায়েক ঢাকায় আসতে পারেন। তবে নির্বাচনের আগে নয়। উল্লেখ্য, ওই সভাতেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটা হল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫০ শতাংশ ব্যারাকে ফিরিয়ে আনা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি সিদ্ধান্তই ভারতকে মাথায় রেখে নেওয়া। একটা ভয় কাজ করতে শুরু করেছে মুহাম্মদ ইউনূসদের অন্তর্বর্তী সরকারের অন্দরে।
উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা প্রথম থেকেই ভারত বিরোধী মনোভাব নিয়ে চলছেন। তাঁদের পৃষ্টপোষকতায় বাংলাদেশের একটা বড় অংশ বিভিন্ন ভারত বিরোধী কার্যকলাপ চালাচ্ছে। তাঁদের মধ্যেই একটি কট্টরপন্থী সংগঠন বিতর্কিত এবং ভারতে মোস্ট ওয়ান্টেড জাকির নায়েককে ঢাকায় নিয়ে আসতে চাইছিলো। কিন্তু ভারত বিগত কয়েকদিনে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, বিশেষ করে সামরিক তৎপরতায় সেটা দেখেই আতঙ্ক বেড়েছে ঢাকার। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ দাবি করছে, গোটা বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয় সেনা যুদ্ধ মহড়া শুরু করছে। তিন বাহিনী একসাথে সেই মহড়া দেবে। বাংলাদেশের নাকের ডগায় ভারত যেহেতু যুদ্ধ মহড়া দিচ্ছে, সেহেতু বাংলাদেশ সেনাকেও হাই এলার্টে থাকতে হচ্ছে। নোটাম জারি হওয়ায় সে দেশের বিমানও ঘুরপথে উড়বে। সবমিলিয়ে প্রবল চাপে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে আর শত্রুতা না বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। তাই জাকির নায়েকের সফরে সরাসরি মানা করে দেওয়া হল। সেই সঙ্গে নির্বাচন নিয়েও একটা বার্তা দেওয়া গেল












Discussion about this post