মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধান, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার পর এবার কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিলেন বাংলাদেশের পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রশ্ন উঠছে, ভারত কী তাঁকে এবার খোলা ছাড় দিয়ে দিল, নাকি এটা ভারতের দীর্ঘমেয়াদী কোনও পরিকল্পনা। বিবিসি বাংলা সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার শিরোনাম হল – অতিথি শেখ হাসিনাকে ভারত কি ধীরে ধীরে ‘আনলক’ করতে দিচ্ছে? কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও এখন এটাই চর্চার। আচমকা শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক এবং ভারতীয় গণমাধ্যমে তিনি একের পর এক সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন, নিজের, দলের এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক দাবি করছেন। যা দেখে মনে হচ্ছে, আবারও আন্তর্জাতিক মঞ্চে শেখ হাসিনাকে একটা স্থান করে দিতে বা প্রতিষ্ঠিত করতে ভারতের একটা পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাঁকে ছাড় দিয়েছে নয়া দিল্লি।
বৃহস্পতিবার ভারতের দ্য উইক, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য হিন্দু, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো একাধিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শেখ হাসিনা। প্রায় ৯ মাস আগে ঢাকায় শেখ মুজিবের বাসভবন ৩২ নম্বর ধানমন্ডি ভাঙচুরের পর বাংলাদেশ সরকার একটি বিবৃতি দিয়েছিল। তাতে দাবি করা হয়েছিল, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাই সোশ্যাল মিডিয়াতে লাগাতার মিথ্যা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছেন। আর সেই কারণেই এই ধরণের সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। সেই সময় অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল ভারতের উচিত হাসিনার মুখে রাশ টেনে ধরা। এমনকি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদও জানানো হয়েছিল। ঠিক তার পর দিনই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক পাল্টা বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছিল, শেখ হাসিনা যা বলছেন তা তিনি ‘ব্যক্তি শেখ হাসিনা হিসেবে’ বা ব্যক্তিগতভাবে বলছেন। এই ব্যাপারে ভারত সরকারের সেখানে কোনও ভূমিকাই নেই। সেটা ছিল বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সোশ্যাল মিডিয়ায় বলা বক্তৃতা এবং অডিও ক্লিপের প্রসঙ্গে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রীতিমতো সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের থেকেও এই গণমাধ্যমের ক্ষমতা ও প্রভাব অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, গত বছর আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের জেরে বাংলাদেশ ছাড়া শেখ হাসিনা প্রায় ১৫ মাস পর গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করলেন। এটা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। গত বছরের ছাত্র-জনতা বিদ্রোহের সময় ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির’ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এবার দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আন্দোলনের সময় বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় কার্যত দোষ স্বীকার করলেন। এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে দায় এড়িয়েছিলেন তিনি।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, আপনি কি রাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত হিংসার জন্য দায় স্বীকার করেন? এই প্রশ্নের জবাবে হাসিনার মন্তব্য, আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছিলাম, এই অভিযোগ মৌলিক ভাবে ভুল। তবে তিনি বলেন, দেশের নেত্রী হিসেবে, আমি চূড়ান্ত ভাবে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করি। পাশাপাশি এই প্রাণহানি বা আইনশৃঙ্খলার আরও অবনতির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত ভাবে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন যে, সুযোগ পেলে তাঁর দল আওয়ামী লীগ অবশ্যই দেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। তাঁর দাবি, আমরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি না। বরং, আমরা আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করতে চাই। কিন্তু বাংলাদেশে এখন এমন একটি প্রশাসন রয়েছে, যারা আমাদের তা করতে নিষেধ করেছে। যারা নিজেই অনির্বাচিত এবং যাদের গণতন্ত্রের প্রতি স্পষ্টতই কোন শ্রদ্ধা নেই। অর্থাৎ ঘুরিয়ে সেই মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকেই কাঠগড়ায় তুলছেন উৎখাত হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ওয়াকিবাহল মহলের মতে, এটাই আসল চাল। শেখ হাসিনাকে এমন একটা সময় মুখ খোলার অনুমতি দিয়েছে যখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস চুরান্তভাবে ব্যর্থ হিসেবে উঠে এসেছেন। আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর সমালোচনা হচ্ছে, তাঁর আমলে হত্যা, মব, বিশৃঙ্খলা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সরব হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্প-বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাঙ্কের মতো সংস্থা। ঠিক সেই সময়ই হাসিনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলিতে একের পর এক বিস্ফোরক দাবি করে চলেছেন। যা আন্তর্জাতিক মহলে শোরগোল পড়ছে। মুহাম্মদ ইউনূস আরও চাপে পড়ছেন। বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, শেখ হাসিনা ভারতের সহযোগীতায় রাশিয়া, চিন ও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথেও কথা বলেছেন বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠ, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগের নির্বাসন তোলার বিষয়ে। কয়েকদিনের মধ্যেই এই চাপটাও আসবে ইউনূসের কাছে।












Discussion about this post