ভারতের ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত, শিলিগুড়ি করিডোরটি একটি সংকীর্ণ ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ স্ট্রিপ। যা ভারতের মূল ভূখণ্ডকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের সাথে সংযুক্ত করে। এছাড়া আরেকটি ছোট রাজ্য সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তরপ্রান্তের কয়েকটি জেলাও এই অংশের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে অবস্থিত এই করিডোর ভারতের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের পয়েন্টগুলির মধ্যে একটি। আপনাদের মনে আছে নিশ্চই ২০১৭ সালে ভারত ও চিনের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি সীমান্ত বিরোধ হয়েছিল ডোকালাম মালভূমিকে কেন্দ্র করে। এটি ভুটান-চীন-ভারত সীমান্তের কাছে অবস্থিত, যেখানে চিন রাস্তা নির্মানের চেষ্টা করতে ভারতীয় সেনা বাঁধা দেয়। রক্তক্ষয়ী ওই সংঘর্ষে ভারত ও চিনের একাধিক সেনা শহীদ হয়েছিলেন। জানা যাচ্ছে আপাতত আলোচনার পর, উভয় দেশ ডোকালাম থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও চিন এর আশেপাশে রাস্তা ও নানা অবকাঠামো নির্মানকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কম যাচ্ছে না ভারতও, তাঁরাও শিলিগুড়ি করিডোরকে কেন্দ্র করে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। যাতে যে কোনও সময় আপাতকালীন পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ি করিডোর ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। এর জন্য ২২ কিমি শিলিগুড়ি করিডোরের প্রস্থ বৃদ্ধি করার দাবিও বিবেচনাধীন বলেই জানা যাচ্ছে। ঠিক এই আবহেই গত বছর ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল হয়। শেখ হাসিনা-সহ তাঁর সরকারের পতন ঘটনো হয় এক পরিকল্পিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসে শান্তির জন্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারপর থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কে শীতলতা আসতে শুরু করে। ইউনূস সাহেব তাঁর চালিকাশক্তি জামাত শিবিরের মাধ্যমে পাকিস্তানকে ডেকে আনেন বাংলাদেশে। পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সখ্যতা বৃদ্ধি করেন প্রধান উপদেষ্টা সেই সঙ্গে চিনকেও আহ্বান জানান ভারতের সেভেন সিস্টার্সের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে বিআরআই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। অর্থাৎ, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে সচেতনভাবে উপেক্ষা করেই চিনকে বাংলাদেশে আহ্বান জানান মুহাম্মদ ইউনূস। এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য একটা মারাত্মক হুমকি। অন্যদিকে বাংলাদেশের উত্তরপ্রান্তে লালমনিরহাটে একটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের এয়ারবেস রয়েছে। যা কার্যত বন্ধ হয়েই ছিল। কিন্তু ইউনূস সরকার এই এয়ারবেস পুনর্জ্জীবন করতে মরিয়া। আর এই এয়ারবেস আধুনিকিকরণ করতে চিনকেই আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ভারতের জন্য একটা ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকটা পাকিস্তানের মতোই।
এই আবহে ভারতও চুপ করে বসে নেই। ভারতীয় সেনার তিন বাহিনীর যৌথভাবে পরিচালিত অপারেশন ‘পূর্বী প্রচণ্ড প্রহার’। যা একটি ভবিষ্যৎমুখী মহড়া হিসেবেই দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। এই যৌথ মহড়া জোরকদমে চলছে অরুণাচল প্রদেশের উচ্চ পাহাড়ি এলাকা মেচুকায়। ভারতের স্থল, বায়ু ও নৌ সেনা যৌথভাবে এই মহড়া দিচ্ছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, হিমালয়ের কোলে অরুণাচল প্রদেশের মেচুকায় উচ্চ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যে যুদ্ধ মহড়া চলছে সেখানে নৌবাহিনীর কাজ কি? এটাই আসল ট্যুইস্ট বলে মনে করছেন ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্পিয়ারহেড ডিভিশন, ভারতীয় বিমান বাহিনী, ভারতীয় নৌবাহিনী এবং ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপি যৌথভাবে পূর্ব হিমালয়ে এই যুদ্ধ অনুশীলন করছে। হিমালয়ের সুউচ্চ তুষারাবৃত শৃঙ্গ এবং প্রত্যন্ত উপত্যকার পটভূমিতে এই অনুশীলনটি দ্রুত গতিশীলতা, নির্ভুল সমন্বয় এবং অপারেশনের সম্পূর্ণ দিক ও বহু-ডোমেন ইন্টিগ্রেশন যাচাই করার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। জানা যাচ্ছে, হিমালয়ের কোলে দুর্গম এবং প্রত্যন্ত এলাকায় হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান, মানববিহীন উড়ুক্কুযান বা অ্যাটাক ড্রোন, বিস্ফোরক ড্রোন, এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক যুদ্ধসম্ভারের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একটা ইন্টিগ্রেটেড মডিউল তৈরি করতে চাইছে ভারত। এই মহড়ায় ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীগুলির পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাও অংশগ্রহন করছে। অপরদিকে, নৌবাহিনীও এই মহড়ায় রয়েছে। ফলে মনে করা হচ্ছে আপাত দৃষ্টিতে চিনকে লক্ষ্য রেখে অপারেশন ‘পূর্বী প্রচণ্ড প্রহার’ মহড়া হলেও বাংলাদেশও এর উপলক্ষ্য। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, অপারেশন ‘পূর্বী প্রচণ্ড প্রহার’ এমন একটা সময়ে হচ্ছে, যখন ভারত শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেকের আকার বৃদ্ধি করতে চাইছে। অনেকেই দাবি করছেন, ইতিমধ্যেই ভারত চিকেন নেকের পরিধি বাড়িয়ে নিয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অভিযান চালিয়ে। যদিও এর সরকারি সত্যতা নেই। কিন্তু সবমিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ এবং জোরদার অস্ত্রভাণ্ডার মোতায়েনের প্রমাণ স্পষ্ট।












Discussion about this post