নয়া দিল্লিতে ভারত সরকারের আশ্রয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভারতে বসেই প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ার নানা প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন সময় বক্তব্য রেখে, দায়মুক্তি নামে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে কোনও গণমাধ্যমে তাঁর সরাসরি বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার দেখা যায়নি এতদিন। কিন্তু বিগত কয়েকদিনে সেই আগলও খুলে গেল। শেখ হাসিনা একের পর এক আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তিনি। তবে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে কেবলমাত্র ইমেল ভিত্তিক প্রশ্নাবলীতে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, এবার হয়তো তাঁকে ভিডিও সাক্ষাৎকার দেবেন শেখ হাসিনা। আমাদের আলোচনা শেখ হাসিনার পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়েই।
ঢাকার অপরাধ ট্রাইবুনালে শেখ হাসিনা এবং তাঁর আমলের কয়েকজন কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে একটি মামলার রায় আগামী সোমবার অর্থাৎ ১৭ নভেম্বর দেওয়া হবে। কিন্তু ইউনূস সরকারের এই প্রচেষ্টা সফল হতে দিচ্ছেন না পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা। তিনি জানতেন, ওই অপরাধ ট্রাইবুনালকে হাতিয়ার করে মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর দোসররা একটা লোকদেখানো বেআইনি বিচারের মাধ্যমে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে মরিয়া। যাতে বহির্বিশ্বে শেখ হাসিনাকে ভয়ানক মানবতাবিরোধী এবং গণহত্যাকারী প্রতিপন্ন করা যায়। তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করা যায়। তাই তিনি অতি গোপনে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ্যে দুই ধরণের প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। আর এটা করা সম্ভব হয়েছে ভারতের প্রযুক্তিগত সাহায্যেই। শেখ হাসিনা এই পর্বে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থকদের কাছে হয়তো পৌঁছতে পারেননি, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এতেই কাজ হয়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আওয়ামী কর্মী-সমর্থকরা শেখ হাসিনার দ্বারাই উজ্জীবীত হয়ে দ্বিগুণ উৎহাসে রাস্তায় নেমে পড়লেন ভয়-ডরকে দূরে ঠেলে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে গেলেন। আওয়ামী লীগের আমলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের চিত্র তুলে ধরে বর্তমান ইউনূস সরকারের হাল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে শুরু করলেন। কর্মহীন, দরিদ্র ও খেঁটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষগুলো বুঝলো কি ভুল করে ফেলেছেন। পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষজনও বুঝতে পারলো মুহাম্মদ ইউনূসের ফাঁকা বুলি আর তাঁর সরকারের ছলচাতুরি। ব্যাস, এবারই সুচতুরভাবে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে নানা কর্মসূচির ডাক দিতে শুরু করলো। এতদিন যা হতো গোপনে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর প্রশাসন দেখলো আওয়ামী লীগের ডাকে একের পর মিছিল, প্রতিবাদ সভায় উপচে পড়া ভিড়। কেউ বাঁধা দিতে এলেই সাধারণ মানুষের রুখে দাঁড়ানো। যেন দেশের সাধারণ মানুষই আওয়ামী লীগের সভ্য সমর্থকদের পাশে দাঁড়িয়ে পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বলা ভালো কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা।
এবার জানা যাক, শেখ হাসিনা একের পর এক আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন কেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা কার্যত নিজেকে অন্তরালেই রেখেছিলেন। সে সময় মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং মার্কিন স্পর্শ তাঁকেই হিরো বানিয়ে রেখেছিল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। ফলে তাঁর বক্তব্যই একতরফাভাবে প্রচারিত হচ্ছিল। কিন্তু ক্রমশ বদল হওয়া ভূ-রাজনীতি আচমকাই শেখ হাসিনাকে একটা সুযোগ এনে দেয়। আর সেটারই সম্পূর্ণ ফায়দা লুটলেন শেখ হাসিনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন পররাষ্ট্র নীতি কোনও সরকার বদলের খেলায় আর যাবে না ওয়াশিংটন। এই খবর যেমন মুহাম্মদ ইউনূসের মাথায় বাজ পড়ার সামিল, তেমনই হাসিনার পক্ষে অক্সিজেন। হাসিনা একাধিক বিদেশী সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করলেন, এবং সেগুলো ফলাও করে ছাপতেও শুরু করল তাঁরা। ফলে ইউনূসের মুখোশ খুলতে শুরু করলো, এবং তাঁর মিথ্যার ভান্ডার ধরা পড়তে লাগলো। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে ভাবে উন্নতি হচ্ছে, ঠিক সে ভাবেই শেখ হাসিনা মার্কিন ঘনিষ্ট হতে শুরু করেছেন। খেয়াল করে দেখবেন, প্রথমদিকে দুই-একটি বাদে হাসিনার কোনও সাক্ষাৎকারে আর মার্কিন প্রসঙ্গেই তাঁর গদিচ্যুতি প্রসঙ্গ থাকে না। হংকংভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, বর্তমানে ওয়াশিংটন ও ঢাকার সম্পর্ক নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। তবে আমি জানি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব সময়ই ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি নিজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের প্রশংসক এবং আমি এটা প্রকাশ্যেই বলে এসেছি। অবশ্যই ট্রাম্প ড. ইউনূসের ভক্ত নন, তিনি এটা প্রকাশ্যেই বলেছেন। বুঝতেই পারছেন, খেলাটা ঠিক কোথায়।












Discussion about this post