বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় দিয়েছে। গত সোমবার এই রায় আসার প্রায় ঘন্টাতিনেক পর ভারত এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিল, এই রায় তাদের “নজরে এসেছে”। এমনকি ওই বিবৃতিতে “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল” উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেও এক গভীর কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছিল ভারতের বিদেশমন্ত্রক। এই আদালতের নাম উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখে ভারত কার্যত ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তাঁরা এই নামকরণের সঙ্গে একমত নাও হতে পারে। আবার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত যে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবে সেটাও স্পষ্ট করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ভারত মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে কার্যত পাত্তাই দেয় না। তবে সে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। কূটনৈতিক মহল বলছে, সে দিনই নয়া দিল্লি কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে নিয়ে মোদি সরকার ঠিক ভাবছে। তাঁরা যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ইউনূস সরকারের হাতে তুলে দেবে না, সেটাও ঘুরিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থান কি হতে পারে।
শেখ হাসিনার মুত্যুদণ্ডের রায় আসার পর বাংলাদেশের একটা অংশের মনোভাব হল ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভাবতেন, তাঁকে কেউ হারাতে পারবে না, চিরকাল ক্ষমতায় থাকবেন। তাঁর মৃত্যুদণ্ড আমাদের শহীদদের প্রতি ন্যায়বিচারের পথে একটি পদক্ষেপ। তাঁরা এখন এটাও দাবি তুলছেন, আমরা চাই তাঁকে ঢাকাতেই ফাঁসি দেওয়া হোক! কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিষয়টি এত সহজ নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিক্ষোভকারীরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ার সামান্য কিছু সময় আগেই নাটকীয়ভাবে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ সেনার হেলিকপ্টার এবং একটি পরিবহন বিমানে ভারতে পালিয়ে আসেন। এখন তিনি দিল্লিতে বহাল তবিয়তে আছেন এবং গারদের বাইরে বহু দূরে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকার পরও গত ১৫ মাসে বাংলাদেশের বারবার আনুষ্ঠানিক অনুরোধেও ভারত সাড়া দেয়নি। ফলে এবারও যে ভারত সাড়া দেবে না, সেটা সহজেই অনুমেয়।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দাবি, শেখ হাসিনার যে বিচার হয়েছে তা পুরোটাই একপক্ষীয় এবং সাজানো। অপরাধ ট্রাইবুনালের সরকারপক্ষ এবং সরকার নিযুক্ত আসামীপক্ষের আইনজীবী সকলেই যুদ্ধোপরাধীদের পক্ষে একসময় সাওয়াল করেছিলেন। ফলে তাঁদের নিয়োগের উদ্দেশ্য কি সেটা কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আওয়ামী লীগের নেতা কাদের সিদ্দিকি তো স্পষ্ট ভাষায় বলেই দিয়েছেন, এই রায় আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। বিচার প্রক্রিয়া পুরোটাই নাটক। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম যেমন বলেই দিয়েছেন, এই রায় কোনও প্রভাব ফেলবে না। আওয়ামী লীগ যেমন ঐক্যবদ্ধ ছিল, তেমনই থাকবে। তাঁর দাবি, দলের পক্ষ থেকে লড়াই থেমে থাকবে না, সে দলের শীর্ষ নেতারা যতই বাংলাদেশের বাইরে থাকুক না কেন। আর এটাই এখন আওয়ামী লীগের একমাত্র পথ। বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং তাঁর দোসরদের দুর্নীতি এবং অত্যাচার সে দেশের মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের একটা আবেগ আবারও গড়ে উঠছে। তাই তাঁদের পরপর কর্মসূচিগুলি সফল হচ্ছে। আরেকটা বিষয়, আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে ককটেল বোমা, অগ্নিসংযোগের যে ঘটনা ঘটছে, সেটাও কিন্তু যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, আসলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন ফিরিয়ে আনার জন্য বিদেশী শক্তির হাত রয়েছে। তাঁদের ইঙ্গিত ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থার দিকে। ফলে তাঁরা মনে করছেন, যে কোনও মুহূর্তে একটা রফা হয়ে যেতে পারে। তখনই আওয়ামী লীগ ভোটে লড়ে বা না লড়ে স্বমহিমায় ফিরবে। যদি ভোটে লড়ার সুযোগ না পায় আওয়ামী লীগ, তাহলেও নির্দল বা ছোট দলের আড়ালেও ভোটে লড়বে আওয়ামী লীগ।












Discussion about this post