বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতে হামলার ছক কষা হচ্ছে। দিল্লি বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে এনআইএ এমন তথ্য হাতে পেয়েছিল। বিভিন্ন প্রমাণ, ধৃত জঙ্গিদের বয়ান বাংলাদেশ যোগ আরও পোক্ত করেছে। এবার বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের হাতে ‘ডসিয়ার’ বা প্রমাণপত্র হস্তান্তর করে দিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। প্রসঙ্গত, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে যোগ দিতে এসেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। তিনি একদিন আগেই দিল্লি পৌঁছন এবং বুধবার ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, ওই বৈঠকেই খলিলুর রহমানের হাতে পাকিস্তানী আইএসআই ও জঙ্গি যোগসাজশ, বিভিন্ন জঙ্গি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের স্যাটেলাইট ইমেজ ও ডিজিটাল রেকর্ড-সহ বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সক্রিয়তার নানা তথ্য প্রমাণ তুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঢাকাকে কড়া বার্তা দিয়েছে ভারত।
শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে শীতলতা এসেছে সেটা সবাই জানেন। সেই সঙ্গে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণতর হয়েছে সেটাও অনেকে জানেন। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ক্ষমতার যুদ্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে। সম্প্রতি শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। এরপরই বাংলাদেশ কড়া বিবৃতি জারি করেই ক্ষান্ত থাকেনি রীতিমতো ভারতকে নোট ভারবাল বা কূটনৈতিক স্তরে চিঠি দিতে তৎপর হয়েছে। শেখ হাসিনা এখন “পলাতক দোষী” তাই ভারতের কর্তব্য ও দায়িত্ব তাকে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তর করা। এমনই বক্তব্য ঢাকার। এই আবহেই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান নয়া দিল্লি এসেছেন। তিনি ভালোতে জাতীয় উপদেষ্টার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করেন। জানা গিয়েছে, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড বা সম্ভাব্য রায় নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সতর্কবার্তাও দিয়েছে ভারত। এমনও জানা যাচ্ছে, ওই বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ভারতীয় সেনার কয়েকজন শীর্ষ কর্তাও উপস্থিত ছিলেন। জানা গিয়েছে, খলিলুর রহমান ও অজিত ডোভালের মধ্যকার এই বৈঠকে জঙ্গিবাদ দমন এবং শেখ হাসিনার বিচার ইস্যুতে ভারতের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। যা কার্যত আল্টিমেটামের রূপ নিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ওই বৈঠকের সবচেয়ে উত্তপ্ত বিষয় ছিল আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ। ভারতের অভিযোগ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অজিত ডোভাল অভিযোগের স্বপক্ষে খলিলুর রহমানের হাতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ডসিয়ার’ বা প্রমাণপত্র তুলে দেন। এই নথিতে জঙ্গিদের গোপন আস্তানা, ডিজিটাল যোগাযোগ রেকর্ড, স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ধৃত জঙ্গিদের জবানবন্দি রয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ওই বৈঠকে। উল্লেখ্য সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পহেলগাঁও হামলার পর যেমন অপারেশন সিঁদুর হয়েছিল। দিল্লি হামলার পরও সেরকম কিছু হতে পারে। তবে এবার পাকিস্তান ছাড়াও বাংলাদেশ ও তুর্কির যোগ পাওয়া যাচ্ছে। আরও জানা যাচ্ছে, নিরাপত্তা ইস্যুর বাইরেও রাজনৈতিক আলোচনায় বড় ছায়া ফেলেছে শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ। কূটনৈতিক সূত্রের খবর, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড বা তার বিরুদ্ধে কঠোর কোনো রায় হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ভারত চরম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
সবচেয়ে বড় যে ঘটনা জানা যাচ্ছে, ওই বৈঠকের দ্বিতীয় পর্বে এক নজিরবিহীন ঘটনা দেখা যায়। যেখানে অজিত ডোভাল ও খলিলুর রহমানের সাথে বৈঠকে যোগ দেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত। পাশাপাশি প্রথম থেকেই ছিলেন বাংলাদেশের দুই শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা। সেখানে নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি ‘ইনক্লুসিভ’ বা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তৃতীয় কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বৈঠক শেষে খলিলুর রহমান দ্রুত ঢাকা ফিরে এলেও, ভারতের দেওয়া এই ডসিয়ার এবং রাজনৈতিক বার্তা ঢাকার জন্য বড় ধরনের অস্বস্তি ও চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।












Discussion about this post