বাংলাদেশে নাটকের রঙ্গমঞ্চের অপর নাম হল ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’। আর সেই রঙ্গমঞ্চের সেরা অভিনেতা হলেন তাজুল ইসলাম। যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বা বাংলাদেশের মুখ্য সরকারি আইনজীবী। কেন এ কথা বলছি? আসলে গত রবিবার ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনা ঘটে গেল। মামলা চলাকালীন দুই পক্ষের আইনজীবীর বাক্য বিনিময়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটে, কিন্তু এখানে যা হল, সেটা বেশ অবাক করেছে ওয়াকিবহাল মহলকে। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজনীন নাহারকে খোলা আদালতেই হুমকি দিলেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। আসামিপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “চুপ করে থাকেন, কথা বলবেন না। আপনাকেও আসামি করা যাবে। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাচ্ছি”। যা নিয়ে বাংলাদেশের আইনজীবী মহলে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে এর আগেও বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের বিচার এবং সাজা ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। প্রত্যেকেই এই আদালতের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। গত রবিবারের ঘটনা সেই প্রশ্নগুলিকেই কার্যত মান্যতা দিল। সম্প্রতি একটি মামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। তাঁদের ঢাকা সেনানিবাসেই একটি সাব জেল তৈরি করে রাখা হয়েছে। তাঁদেরই একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। তাঁর পক্ষে মামলা লড়ছেন আইনজীবী নাজনীন নাহার। তিনি সাওয়াল চলাকালীন আদালতকে জানান, তার মক্কেলের সেফ হাউসে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি, অথচ আইন অনুযায়ী আইনজীবীর উপস্থিত থাকার অধিকার আছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমাকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি, ভেতরে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। এরপরই কার্যত ক্ষেপে যান মুখ্য সরকারি আইনজীবী তাজুল ইসলাম। উল্টে আসামিপক্ষের আইনজীবী নাজনীন নাহারকেই আসামি করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বসেন। আদালতকক্ষে উপস্থিত সাংবাদিক ও আইনজীবীদের দাবি, এ ধরনের সরাসরি হুমকি আগে খুব কমই শোনা গিয়েছে। এটা অত্যন্ত কুরুচিকর ব্যাপার। এতে ট্রাইবুনালের গড়িমা নষ্ট হল অথচ বিচারপতিরা চিফ প্রসিকিউটরকে সতর্ক করলেন না। এতে তাঁর দাপটের পরিচয় পাওয়া গেলেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও চাপে পড়বেন মুহাম্মদ ইউনূস।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বারের তরফে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিপজ্জনক প্রবণতা। প্রধান কৌঁসুলি নিজেই যদি খোলা আদালতে ডিফেন্সের আইনজীবীকে আসামি বানানোর হুমকি দেন, তাহলে আসামিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে? ভারতীয় গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি এমনকি জাতিসংঘও এই একই দাবি তুলছে। কিন্তু তাজুল ইসলাম আছেন তাঁর জায়গাতেই। ফলে আইসিটি’র কার্যক্রমে ক্রমাগত সমালোচনার মুখে পড়ছে। ভাবখানা এমন, তিনি এবং সরকারের পক্ষ থেকে যারা মামলায় অংশগ্রহন করছেন তাঁরা ছাড়া আর কেউ সত্যি কথা বলেন না। শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তিনিও সামান্য কিছু যুক্তি ছাড়া আদালতে আর কিছু করেননি। এমনকি আদালত কক্ষের ভিতর তাঁর একটি কথপোকথনের ভিডিও ভাইরালও হয়ে গিয়েছিল। আবার রায় বের হওয়ার পর তিনি হেসে হেসে নিজের কষ্ট প্রকাশ করার ভিডিও সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল। আওয়ামী লীগ প্রথম থেকেই দাবি করছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাঁরা আইনজীবী নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ক্রমাগত হুমকি এবং নানা আইনের বেরাজালে তাঁদের ফাঁসিয়ে আইনজীবীদের মামলা থেকে দুরে সরিয়ে রাথা হয়েছে। এবার অবশ্য শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া গুম-খুনের অভিযোগে দায়ের হওয়া দুটি মামলায় তাঁর আইনজীবী হিসাবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বাংলাদেশের স্বনামধন্য আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তিনি নিজেই এই ব্যাপারে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে আর্জি জানালে তা মঞ্জুর করেছেন বিচারপতি। ফলে অশীতিপর এই আইনজীবীকে নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁকেও কি অপদস্থ করবেন প্রবল প্রতাপশালী তাজুল ইসলাম?












Discussion about this post