ভারতের মাটিতে পা রাখার আগে সব মহলের নজর ছিল শেষপর্যন্ত তিনি কি তাঁর গাড়ি ‘অরাস সেনাত’, বিশ্বজুড়ে যার পরিচয় ‘ফোর্টেস অন হুইলস’ –এ উঠবেন? গাড়ির দাম সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। সেই গাড়িতে চেপে তিনি কি পালাম এয়ারবেস ছাড়বেন? সেটা হল না। কারণ, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিমান থেকে নামতেই যাবতীয় প্রটোকল ভেঙে তাঁকে জড়িয়ে ধরে ‘রিসিভ’ করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। এই আলিঙ্গন তো হওয়ার কথাই ছিল। যাঁকে তিনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর জন্যই তিনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। সে কথা তাঁর যেমন মনে আছে, মনে আছে গোটা দুনিয়ার।
তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা বৈঠকে ১ সেপ্টেম্বর চিন গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে রুশ প্রেসিডেন্টের ‘অরাস সেনাত’ এ বসেছিলেন টানা ৪৫ মিনিট। আর ওই সময়ে বাংলাদেশে চলে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। মোদির গুপ্তঘাতককে কে বা কারা হত্য করে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের সেই অবদান প্রধানমন্ত্রী ভুলে যাবেন কী করে? দিল্লির কনকনে শীতে গোটা দুনিয়া দেখল তাঁর উল্টো ছবি। তাই দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ি ‘ফরচুনার’- এ (গাড়ির নম্বর MH01EN5795) চেপে দুই নেতা ৭ নম্বর লোককল্যাণ মার্গে পৌঁছান। । ‘ফরচুনার’ এর পিছু পিছু চলল ‘অরাস সেনাত’। নিঃসন্দেহে এ বিরল কূটনৈতিক সৌজন্যের নজির। এই সৌজন্য দুই নেতার মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তুলে ধরে। রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার দুদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে এসেছেন।
রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গাড়িতে যোগ দেওয়ার জন্য। পুতিন ভারতে অবতরণ করার পর তাকে আনুষ্ঠানিক স্বাগত জানানো হয়, যা ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ককে তুলে ধরে। পুতিনের ভারত সফর পশ্চিমের দেশগুলোর বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বজায় রাখার জন্য রাশিয়ার প্রচেষ্টাকেই তুলে ধরে। এই সফর বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার নীতিকে তুলে ধরে, যেখানে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখা হচ্ছে। মূল আলোচনার মধ্যে ইউক্রেন সংঘাত, আফগানিস্তান এবং ভারত-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
ভারতে রওনা হওয়ার আগে ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছিলেন, ‘ভারত-রাশিয়ার বন্ধুত্ব বহু পুরনো। ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই তা তৈরি হয়েছে। তাতে কোনও ফাটল ধরেনি। ’প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁকে স্বাগত জানিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, ‘আমি আমার বন্ধু রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে স্বাগত জানাচ্ছি।… এই দুই দেশের সখ্য সমন্বয়ের সারণিতে মাপা যায় না। দু’দেশের মানুষ তাতে উপকৃত হয়েছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানকে গীতা উপহার দিয়েছেন মোদী। তবে তা রুশ ভাষায় অনূদিত। এক্স হ্যান্ডলে বিশেষ এই উপহারের কথা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘গীতার শিক্ষা পৃথিবী জুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়।’’
ওয়াকিবহাল মহলের ব়ডো অংশের মত, দুই রাষ্ট্রনেতার কথা ও বডি ল্যাঙ্গোয়েজের মধ্যে যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা বর্তমান বিশ্বের ভূ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, ইউরোপীয় দেশগুলো ভারতকে অনুরোধ করেছে যাতে মোদি নরম করে হলেও ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য পুতিনকে চাপ দেন। এদিকে আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন, পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ অত্যন্ত আগ্রহী।
২০২১ সালের পর এটি পুতিনের প্রথম ভারত সফর। ২০২২ সালে মস্কো ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরু করার পর এই সফরে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জ্বালানি অংশীদারিত্ব বাড়ানোর উপর নতুন করে জোর দেওয়া হবে। এই সফরে দিল্লি ও মস্কোর মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার জন্য চাপ বাড়িয়েছে।












Discussion about this post