রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার ৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লিতে চলে এসেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে স্বাগত জানাতে খানিকটা প্রথা ভেঙেই বিমানবন্দরে পৌঁছে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর নিজের গাড়িতে করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে নিজের বাসভবন ৭ নম্বর লোক কল্যাণ মার্গে নিয়ে যান তিনি। ভাবখানা এমন যেন দুই বন্ধু বহুদিন পর একসাথে মিলিত হয়েছেন। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। তবুও নির্ভয়ে তিনি ভারত সফরে এলেন। আবার কাকতালীয় ভাবে ভারতেই অবস্থান করছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বিরুদ্ধেও ঢাকার আন্তর্জাতিক আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, একটি মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। দুটোই আন্তর্জাতিক আদালত, দুটি থেকেই গ্রেফতারি পরোয়ানা, তবুও ভারত সরকার কাউকে গ্রেফতার করছে না। বরং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁদের স্বাগত জানানো হয়েছে এবং অন্যান্য প্রটোকল মেনেই তাঁদের আথিতিয়তা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাপারটা কি হল? কিসের ভিত্তিতে ভারত এটা করতে পারছে, এই প্রশ্ন তুলছে বাংলাদেশের একটা মহল।
বলা হচ্ছে, ভ্লাদিমির পুতিনের এই সফর বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়েছে, কারণ ২০২৩ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর থেকে এটি তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী সফর। পুতিন সচরাচর কোনও দেশে সফর করেন না। এর আগে আমরা দেখেছি তিনি চিনে ও দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছিলেন। এরপর ভারতে এলেন। যদিও কয়েকমাস আগেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট আলাস্কায় গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। কোনও ক্ষেত্রেই তিনি গ্রেফতারের মুখে পড়েননি। তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার মানে কি?
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভারত কি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসির পরোয়ানা কার্যকর করতে এবং একজন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করতে বাধ্য? ভারতের সার্বভৌম আইনি কাঠামো এবং দীর্ঘস্থায়ী পররাষ্ট্র নীতির মধ্যে নিহিত দ্ব্যার্থহীন উত্তর হল, না-ভারত বাধ্য নয়। আগে জেনে নেওয়া জরুরি, পুতিনের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানা কেন জারি করা হয়েছে? ২০২৩ সালের ১৭ মার্চ, আইসিসি-র প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-২ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং তাঁর শিশু অধিকার কমিশনার মারিয়া লভোভা-বেলোভার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের অধিকৃত অঞ্চল থেকে জনগণকে বিশেষত শিশুদের অবৈধভাবে নির্বাসন এবং স্থানান্তর করার মতো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতার অভিযোগও আনা হয়েছিল। অর্থাৎ, হাজার হাজার ইউক্রেনীয় শিশুকে জোরপূর্বক অপসারণ করার অভিযোগ। আইসিসি বলেছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিনের জারি করা ডিক্রিগুলি শিশুদের রুশ নাগরিকত্ব প্রদান এবং রুশ পরিবার দ্বারা দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে।
এবার আসা যাক ভারতের কথায়। ভারত আইসিসি চুক্তির অংশ নয়। তাই রোম সংবিধানে বর্ণিত পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা, সহযোগিতার দায়িত্ব এবং গ্রেফতার ও আত্মসমর্পণের আদেশ— এর কোনোটিই ভারতের উপর প্রযোজ্য নয়। কারণ ভারত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধানে স্বাক্ষর করেনি। এছাড়া ভারত আন্তর্জাতিক এই চুক্তিটিকে তাঁর দেশীয় আইনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কোনও আইন প্রণয়ন করেনি। তাই ভ্লাদিমির পুতিন বুক ফুলিয়ে নয়া দিল্লিতে এসেছেন এবং তাঁকে গ্রেফতারও করা হচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তো ভারতের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, তাহলে কেন শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে সে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে না ভারত? এ ক্ষেত্রে উল্লেথ করা যেতে পারে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির কয়েকটি ধারা অনুযায়ী ভারত বাধ্য নয় হাসিনাকে ফেরাতে। তবে এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় রয়েছে। সম্প্রতি দিল্লি এসে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান হাসিনাকে প্রত্যার্পণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিশেষ সূত্রের মতে, ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল তাঁকে কড়া উত্তর দিয়েছিলেন। ডোভাল সেদিন খলিলুরকে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা কি ভারতে লুকিয়ে অনুপ্রবেশ করেছিলেন নাকি এটা জি-টু-জি অর্থাৎ দুই সরকারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এসেছিলেন? বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠায়নি? বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে কি ভারতে আশ্রয় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়নি? তাহলে আমরা কেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে ফেরত দেব? এরপর খলিলুর বলার চেষ্টা করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এর উত্তরে ডোভাল নাকি পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, আপনাদের আইটিসি-র সঙ্গে ভারতের কোনও সম্পর্ক নেই। ওই আদালত ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য বাংলাদেশ সরকার তৈরি করেছিল। শেখ হাসিনা কি যুদ্ধাপরাধী? ফলে খলিলুর এর কোনও জবাব দিতে পারেননি এবং কোনও মতে সম্মেলন শেষ করে ঢাকায় উড়ে যান। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, সেটা হল মুহাম্মদ ইউনূস সরকার বলেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি-র দ্বারস্থ হবেন। কিন্তু ভারত তো আইসিসি-র নিয়ম এবং রায় মানতে বাধ্য নয়। তাই সেখানে গিয়েও ইউনূসের চিঁড়ে ভিজবে না। তাই পুতিন হোক শেখ হাসিনা। ভারত তাঁদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রেখেছে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post