ইনিও দাউদ।
তবে এই দাউদ বাংলাদেশের। তা হলেও ওই কুখ্যাত দাউদের সঙ্গে তার অসম্ভব মিল রয়েছে। দুই দাউদই অন্ধকার জগতের বেতাজ বাদশাহ। এমন কোনও অসামাজিক কার্যলাপ নেই যাতে হাত পাকাননি বাংলাদেশের দাউদভাই। সে সব করে নাম কামিয়েছেন। যশও অর্জন করেছেন। রাতারাতি বিশাল সম্পত্তির মালিক বনে যান। ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুসারে, দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর বেশ ভালই যোগাযোগ। দুই দাউদ একে ওপরের পড়শি। দুইয়ের বাড়ি বালোচিস্তানে। বাংলাদেশের এই দাউদের পরিচয় ‘লর্ড অব ড্রাগস’ নামে। ‘মাফিয়া জগতের ভগবান’। অদৃশ্য হয়েও প্রবলভাবে দৃশ্যমান এই দাউদ। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে গিয়েছেন বরাবর। এই দাউদের শুভ নাম ফয়সাল করিম।
বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং জাহাঙ্গীর কবির আলমের খুব কাছের লোক এই দাউদ। তাই, ভয়ংকর অপরাধে জড়িত থাকার পরেও ‘মাফিয়া জগতের ভগবান’-কে বেশিদিন জেলের ভাত খেতে হয়নি। মাথায় আসাদুজ্জামান খান কামালের আশীর্বাদ থাকায় দাউদ কামাল করে দেখান। জেল থেকে ছা়ডা পেয়েই শুরু হয় হাদির ঠেকে যাওয়া-আসা। সাম্প্রতিক অতীতে তাঁর খুব একটা নাম-ডাক শোনা যেত না। কিন্তু হাদি-কাণ্ডে জড়িয়ে গিয়েছে সে।
সমাজ মাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। যদিও নিউজ বর্তমান সেই ভাইরাল হওয়া ছবির সত্যতা যাচাই করেনি। ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা গিয়েছে হাদির ঠেকে রীতিমতো বৈঠকে মেজাজে সে বসে রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই তাকে ‘ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান’ হিসেবে দেখিয়েছেন। তবে মাস্ক করা এই তরুণই যে হাদিকে গুলি করেছেন, কিংবা এই তরুণই যে ফয়সাল, তা নিশ্চিত করে বলছে না পুলিশ।
শোনা যাচ্ছে ফয়সাল করিম নামের ওই তরুণ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৯-য়ের ১১ মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পুর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সুতরাং, ক্ষমতার ঠিক কতটা কাছাকাছি থেকে গিয়েছেন এই দাউদ, তা সহজেই অনুমেয়। হাদি-কাণ্ডে তার নাম জড়িয়ে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু ছবি ভাইরাল হয়েছে। সেই সব ছবির মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ীমী লীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতার পাশেই সে রয়েছে।
লিংকডইনে ফয়সাল করিমের নামে প্রোফাইল আছে। সেখানে তিনি নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিন প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল করিম ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক হন। পরে আরও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন। ২০১৬ সালে ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস’-য়ের (বেসিস) সহযোগিতা ও সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘ব্যাটল অব ৭১’ নামে একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেছিল ফয়সালের মালিকানাধীন ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড।
আরও ভয়ংকর তথ্য রয়েছে। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘আসনভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয়ক কমিটি’ করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ঢাকা–১২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এই আসনের সমন্বয়ক কমিটির সদস্য ছিলেন ফয়সাল করিম। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর ঢাকার আদাবরের বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি এলাকায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুলের চতুর্থ তলায় অফিসে ১৭ লাখ টাকা লুঠ হওয়ার ঘটনা ঘটে। নাম জড়িয়ে যায় ফয়সাল করিমের। ৭ নভেম্বর আদাবর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তার থেকে উদ্ধার হয় দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও পাঁচটি গুলি। ওই মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান ফয়সাল করিম। জামিনের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে গত ১২ অগাস্ট আবারও আবেদন করলে হাইকোর্ট নতুন করে তাঁর এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেন।
জামিনে থাকা অবস্থায় এবার তাঁর বিরুদ্ধে ওসমান হাদিকে গুলি করার অভিযোগ এল। এত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি কীভাবে জামিন পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আর এ রকম লুটের ঘটনায় দুটি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে এতো দ্রুত জামিন দেওয়া হলো কীভাবে, সেই প্রশ্ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন আলোচনা–সমালোচনায় সরব।












Discussion about this post