বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কী বুথে যাবেন? যদিও আওয়ামী লিগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের বলেছেন, কর্মী সমর্থকদের বোঝাতে যাতে তাঁরা ভোটের দিন বুথে না যায়। এ প্রসঙ্গে তাঁর নয়া স্লোগান ‘নো বোট, নো ভোট’। অর্থাৎ, ব্যালটে তাঁর দলের প্রতীক নৌকা না থাকলে ভোট বয়কট করুতে বলছেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এরমধ্যেই একটি ভিডিও ঘটনার মোড় অনেকটাই ঘুরিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি থানা ঘেরাও করে রাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে পুলিশের বাগ্বিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালামকে রীতিমতো ধমকাচ্ছেন। একপর্যায়ে মাহদী হাসান ওসিকে বলেন, ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি কোন সাহসে এটা বললেন। আমি স্ট্রিকলি এখানে আসছি। আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছে নাকি?’ এই ভিডিওতে আরও অনেক কথপোকথন রয়েছে, যা গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী কয়েকদিন বাংলাদেশে পুলিশ হত্যার ভয়াবহ স্মৃতি ফিরে এল। যদিও এ ভিডিও-র সত্যতা নিউজ বর্তমান যাচাই করেনি।
বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম এই খবর করেছে। তাতে জানা যাচ্ছে, শায়েস্তাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হাসানকে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল ছাত্র শায়েস্তাগঞ্জ থানা ঘেরাও করে ধৃত এনামুল হাসানকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানাতে থাকে। তাঁদের দাবি, একসময় ছাত্রলীগ করলেও এনামুল জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তাই তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে। জানা যায়, থানার ওসি নাকি জবাবে বলেছিলেন, আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে? এতেই চটে যান ওই ছাত্র নেতা। এই সময় মাহদীকে বলতে শোনা যায়, ‘জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকার গঠন করেছি। এই জায়গায় আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আপনারা আমাদের ছেলেদের গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছেন। এরপরই ওই ছাত্র নেতা বানিয়াচং থানা পুড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করে নেন। যে ভিডিও এখন রীতিমতো ভাইরাল।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই ভিডিও সেই সময়কার পুলিশ হত্যার বিষয়টি ফের উস্কে দিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্টের অভ্যুত্থানের দিনেই বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচংয় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। বানিয়াচং থানায় হামলা, পুলিশের গুলিতে গ্রামবাসীর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ লোকজন বানিয়াচং থানায় আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগ করে এবং অর্ধশতাধিক পুলিশকে অবরুদ্ধ করা হয়। বিবিসি বাংলার রিপোর্ট অনুযায়ী, পুলিশের গুলিতে অন্তত আটজন গ্রামবাসী নিহত হয়। হাজার হাজার গ্রামবাসী থানা ঘেরাও করে সেখানে থাকা সব পুলিশকে হত্যার হুমকি দিতে থাকেন। এরপর গভীর রাতে পুলিশ সদস্যদের থানার ভেতর থেকে উদ্ধারের সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে ছিনিয়ে নিয়ে থানা চত্তরেই পিটিয়ে হত্যা করে। পরদিন ছয়ই অগাস্ট তার মরদেহ থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। যেভাবে আরও অনেক জায়গায় পুলিশকর্মীদের হত্যা করে গাছে বা ফ্লাইওভারে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানের পরপর। এত বিতর্কের পরও বাংলাদেশের পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে মুখে রা কাড়ছে না অন্তর্বর্তী সরকার। যতটা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের বিচার করতে তাঁরা উদগ্রীব।
এবারও তাই হল। থানায় বসে জুলাই আন্দোলনের নেতা মাহদি হাসান পুলিশকে হুমকি দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি তথা নব্য জুলাই আন্দোলনের নেতা এনামুল হাসানকে জামিন দিয়ে দিল আদালত। মাত্র ২০০ টাকার বন্ডে তাঁকে জামিন দেয় আদালত। যা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাংলাদেশে আদতে আইনের শাসন নেই। ছাত্রনেতা, জামাত নেতারা যা বলছেন তাই কার্যত মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন পুলিশ আধিকারিকরা। এই আবহেই বাংলাদেশ পুলিশকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে ফের সুর চড়ালেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ছাত্রলীগের শতাধিক কর্মী নিহত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ কর্মীদের বাড়িতে না পেয়ে তাদের বাবা–মা ও স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের শোবার জায়গা নেই, যশোরসহ বিভিন্ন কারাগারে ধারণক্ষমতার বাইরে বন্দি রাখা হয়েছে। ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত মানা হবে না। ছাত্রদের মধ্যে বার্তা পৌঁছাতে হবে, সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং অধুনা এনসিপি নেতাদের এই ধরণের আচরণ এবং হুমকিই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার রাস্তা পরিস্কার করে দিচ্ছে। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনা এটা বুঝেই দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করে দিচ্ছেন।












Discussion about this post