ভারত বয়কট দিয়ে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশি সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে যায় বয়কট ইন্ডিয়া হ্যাস ট্যাগে। ভারতীয় পণ্য বয়কটর হিড়িক পড়েছিল যেন। তবে কতটা বয়কট হয়েছিল সেই তথ্য খুব একটা ভারতের জন্য হতাশাব্যঞ্জক ছিল না। তবে বয়কট ভারত আন্দোলন সেবার গণঅভ্যুত্থানের ভিত গড়ে দিয়েছিল বলেই দাবি সে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। সে যাই হোক, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, তথাকথিত সেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল হয়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এরপর থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে অবনতির শুরু। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতকে বিদ্ধ করতে শুরু করে ইউনূস সরকার। দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে, এবার ভারতেও বাংলাদেশি বয়কটের ডাক উঠে গেল। এমনিতেই ভারতে থাকা অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে পুশ ব্যাক প্রক্রিয়া চলছে। এবার অন্যান্য ক্ষেত্রেও বয়কট শুরু হয়ে গেল। ঠিক যেমনটা হয়েছিল পাকিস্তানিদের ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল খেলা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল আগেই। তিনিই ছিলেন আইপিএল নিলামে একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটার। কিছু দিন আগে আইপিএলের নিলামে মুস্তাফিজুরকে ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে কিনেছিল কলকাতা নাইট রাই়ডার্স। এরপরই মুস্তাফিজুরকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠতে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। এই পরিস্থিতিতে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক বোঝাপড়া খারাপ হওয়ার দরুণ বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় যে, মুস্তাফিজুরকে যেন স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁকে যে টাকায় কেনা হয়েছিল, সেটাও কেকেআরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ওই টাকায় তাঁরা অন্য কোনও ক্রিকেটারকে দলে নিতে পারে। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই যেন আগুনে ঘি পড়ে। গোটা বাংলাদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও। বাংলাদেশের আইন ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল কড়া বিবৃতি দেন এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি-কে নির্দেশ দেয় তাঁরা যেন আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে দল না পাঠায়। জানা যায়, প্রথমে বিসিবি নিমরাজি থাকলেও পরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কড়া অবস্থানের জেরে তাঁরা আইসিসি-কে চিঠি দিয়ে ভারতে না খেলতে আসার কথা জানিয়ে দেয়। তবে তাঁদের ম্যাচ শ্রীলংকায় স্থানান্তরিত করার আবেদনও জানানো হয় ওই চিঠিতে। এখন দেখার আইসিসি কি প্রতিক্রিয়া দেয়, কারণ বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থার মাথায় বসে আছেন ভারতের জয় শাহ, যিনি আবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে। ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যতই কড়া চিঠি দিক, ম্যাচ কোথাও সরবে না, উল্টে টি২০ বিশ্বকাপ না খেলতে এলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে তাঁদের। এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ শনিবার তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আমি ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে বলেছি, বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও যেখানে ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না”। অর্থাৎ ভাঙবো তবু মচকাবো না। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের উচিত একটু অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া। আইপিএল আর আইসিসি টি২০ বিশ্বকাপ এক নয়। আইপিএল আয়োজন করে বিসিসিআই, আর বিশ্বকাপের আয়োজক আইসিসি। কিন্তু আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না আসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে বাংলাদেশ বোর্ড। আইসিসি আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু না জানালেও তারাও এ ব্যাপারে বিকল্প চিন্তাভাবনা করছে বলেই জানা গিয়েছে। জানা গিয়েছে, আপাতত তিনটি বিকল্প খোলা থাকছে। প্রথমত, ভারত থেকে বাংলাদেশের ম্যাচগুলি শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাঁরাও এবারের বিশ্বকাপের আর এক আয়োজক দেশ। উল্লেথ্য, গত বছর মহিলাদের বিশ্বকাপেও ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে পয়েন্ট হারাতে হতে পারে এবং ভারতে অনুষ্ঠেয় ম্যাচগুলি ছেড়ে দিতে হতে পারে। এর ফলে বিপক্ষ দলগুলি দু’পয়েন্ট করে পাবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকেই বাতিল করে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্য একটি দেশকে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ দেওয়া হবে।
যেটাই হোক, টি২০ বিশ্বকাপ সূচি মেনেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে ক্রিকেট ডিপ্লোমেসি এবারের বিশ্বকাপের সেরা আকর্ষণ হতে চলেছে। যেমনটা হয়েছিল গত এশিয়া কাপে। যার আয়োজক ছিল পাকিস্তান। ফলে ভারতীয় ক্রিকেট দল পাকিস্তানে যায়নি, এবং ভারতের ম্যাচগুলি দুবাইয়ে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। এবার মুস্তাফিজুর রহমানের একটি ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ হয়তো পাকিস্তানের সেই বদলা নিতে চাইছে। কারণ, বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের গলায় গলায় বন্ধু। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের ম্যাচগুলি শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরিত হলেও ভবিষ্যতের জন্য এই সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সেবার ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠে নামলেও রোহিত-বিরাটরা কোনও পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত মেলাননি। এবারও কি তাই হবে?












Discussion about this post