‘আমার সকল হৃদয় উধাও হবে–’
বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানে আপামর বাংলাদেশবাসীর ‘হৃদয় উধাও হয়েছিল তারার মাঝে, যেখানে ওই আঁধার বীণা আলোয় বাজে। ’
২০২৪-য়ের পালাবাদলের পর থেকে মানুষ একটা ভালো দিনের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সকল পথ খোঁজা যখন সারা হয় তখন শুধু থাকে শেষের অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার শেষে থাকে এক উচাটন, যার রেশ সূর্যাস্তের পরেও থেকে যায়। পরমুহূর্তের জন্য নিজের মুখোমুখি হতে হয়। কী থাকে সেখানে? শুধু শূন্যতা ছাড়া।
কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবে যে জুলাই-অগাস্টের অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশবাসীর হৃদয় উধাও হয়নি? উধাও হয়েছিল বলেই তা তারা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন ক্ষমতার মসনদে যিনি আসীন হয়েছেন, তিনি পদ্মায় এক নতুন সূর্যোদয় ঘটাবেন। রামধনুর সাত রঙে রঙীন হবে বাংলাদেশ। কারণ, জুলাই বিপ্লবের কুশীলবরা যে তরুণ-তুর্কি নেতা। সময় যত গড়িয়েছে তাদের স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে। আর বিপরীতে বাংলাদেশবাসীর অবস্থা হয়েছে ‘সকল দিনের পথ খোঁজা এই হল সারা / এখন দিক-বিদিকের শেষে এসে দিশাহারা / কিসের আশায় বসে আছি অভয় মানি।’
নিরপেক্ষ দৃ্ষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এটা বলাই যায় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মানুষ এক নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় ছিল। সময়ের চোরস্রোতে ভাসতে ভাসতে দেশ ডুবেছে তমশাচ্ছন্ন অন্ধকারে। তাদের শেষ আশা-ভরসা ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ভিন্ন ধারার একটি দল দেখে তারা আশার নতুন সূর্য দেখেছিল। কিন্তু পদ্মার শান্ত স্রোতে শোনা গেল আবার সেই গান – ‘আমার সকল হৃদয় উধাও হবে।’
এনসিপিকে দেখে শুরুতে সবাই ভাবছিল এক নতুন বন্দোবস্তের কথা। কিন্তু পুরনো জোট রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার নিয়ে যে যাত্রা তারা শুরু করেছিল, সেই দলটিই এখন নানা প্রশ্নে বিদ্ধ। দলের মধ্যে চূড়ান্ত মতবিরোধ। যাদের হাত ধরে দলের আত্মপ্রকাশ, তারা একে একে সরে যেতে শুরু করেছেন। দলের অবস্থা এখন মাঝ দরিয়ায় থাকা নৌকোর মতো যে নৌকো প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়েছে। মাঝি আর কোনওভাবেই তার বৈঠা দিয়ে নৌকোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না।
জামাতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতা দলের ওই দলের একাংশ কর্মী-সমর্থকদের রীতিমতো হতাশ করে। এনসিপির মহাসচিব আখতার হোসেন জানিয়েছেন, জামাতের সঙ্গে সমঝোতার কারণ, সংস্কার নিয়ে বিএনপির সঙ্গে তাদের মতোবিরোধ। যদিও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্ত তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়েছে অসন্তোষ, সেই সঙ্গে বিভাজন। দেখা দিয়েছে আদর্শ বনাম কৌশলের দ্বন্দ্ব। এর মধ্যে দল থেকে ১৫ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। দলের একাংশ নেতা মনে করছেন, নিজেদের মধ্যপন্থার নতুন দলটিকে দেশের মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলা ও নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার মাহেন্দ্রক্ষণ ছিল ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। কিন্তু দলীয় নেতৃত্ব এক হঠকারী সিদ্ধান্তের জেরে হারিয়ে ফেলল সেই সুবর্ণ সুযোগ।
এনসিপির বেশ কয়েকজন নেতা বলছেন, জামাতের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর চাপে। এই সমঝোতা ছিল অসচ্ছ। আর তৃতীয় এবং শেষ কারণ, দল তার মূল আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর প্রতিবাদে কম করেও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ১৭জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। দলের অন্যতম নেতা মনিরা শারমিন পদত্যাগ না করলেও তিনি ফেব্রায়ারির ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কে দলে থাকবে আর কে চলে যাবে, এটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। স্বাভাবিকভাবে দলে এক ধরনের সিদ্ধান্ত বিরাজ করছে। আমার পদত্যাগ না করার কারণ হচ্ছ এনসিপি একটি রাজনৈতিক দল। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যে দিয়ে দল তো আর নাই হয়ে যায় না। ’
যায় না ঠিকই। কিন্তু তাঁর দলকে নিয়ে একাংশ বাংলাদেশি যে স্বপ্ন দেখেছিল, যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তাদের সব কিছু আজ কিন্তু আরও একবার উধাও হল।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post