ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। তিনি ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও তিনি ভোটে লড়ার ঘোষণা করেছিলেন। এমনকি নির্বাচনি প্রচারও শুরু করেছিলেন তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই নেতা। কিন্তু ১২ ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এরপর ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। একমাস পার হলেও তাঁর হত্যার প্রকৃত কারণ যেমন জানা যায়নি, তেমনই তাঁর খুনিদেরও ধরা যায়নি। যদিও এই একমাসে ওসমান হাদিকে হত্যার চেষ্টা এবং হত্যার ঘটনা নিয়ে পদ্মার বুকে কম জলঘোলা হয়নি। কখনও বিএনপি, কখনও ভারতের গুপ্তচর সংস্থা র আবার কখনও আওয়ামী লীগকে দায়ী করে একাধিক বয়ান এসেছে। বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর পুলিশও একাধিকবার দাবি করেছে, হাদির খুনিরা ময়মনসিংহ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গিয়েছে। আবার কখনও দাবি করেছে মেঘালয় পুলিশ বা কলকাতা পুলিশ সন্দেহভাজন খুনিদের গ্রেফতার করেছে। যদিও ভারতের দুই রাজ্যের পুলিশই তা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে যাকে মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেই ফয়সাল করীম আবার দুবাই থেকে ফেসবুক লাইভে এসে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবিও করেন। এদিকে হাদির মৃত্যুর জন্য মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসনকেই দায়ী করে বিস্ফোরক দাবি করে বসেন তরুণ ওই নেতার দাদা। তাঁর অভিযোগ ছিল, হাদির মৃত্যুর পিছনে ইউনূস সরকারের ষড়যন্ত্র রয়েছে। এখন সামনে আসছে সম্পূর্ণ অন্য একটি দাবি। হাদিকে নাকি খুন করিয়েছে বাংলাদেশ সেনা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অভিযোগের তির আসছে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের দিকে।
১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকার পুরানো ঢাকার পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ছিলেন ওসমান হাদি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এক ব্যক্তি। পেছন থেকে অনুসরণ করছিল একটি মোটরসাইকেল। বেলা ২টা ২৪ মিনিটে রিকশা চলন্ত অবস্থায় মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ব্যক্তি ওসমান হাদিকে গুলি করে দ্রুতগতিতে চম্পট দেন। ওসমান হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকদের বক্তব্য ছিল, একটি গুলি ওসমান হাদির কানের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার বাঁ পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। তাঁকে ‘লাইফ সাপোর্টে’ নেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ, র্যাব, সিআইডি ও পিবিআইয়ের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্তে কাজ শুরু করেন। সেই ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরালও হয়ে যায়। এমনকি গুলি করা ব্যক্তিকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ লক্ষ টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। অপরদিকে ১৩ ডিসেম্বর পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তারা বলেন, ওসমান হাদিকে সরাসরি গুলি করা ব্যক্তির নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান ওরফে রাহুল। কিন্তু আজও সেই ফয়সাল অধরা। তাহলে কি হাদির খুনিরা কর্পূরের মতো উবে গেল? কেন তাঁদের পাওয়া গেল না, গোয়েন্দা, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি সকলের নজর এড়িয়ে একমাস ধরে তিনি কোথায় রয়েছেন?
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন অন্য একটি তত্ত্ব ভেসে উঠেছে। ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান ওসমান হাদির পুরোনো একটি ভাষণ এখন সামনে এনে বলা হচ্ছে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুখ খোলায় মরতে হল তাঁকে।
হাদির এই বক্তব্যেই স্পষ্ট, তিনি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যেমন মুখ খুলেছিলেন। তেমনই সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেছিলেন। হাদি বলেছিলেন, সাহস থাকলে ক্যু করে দেখান। জনগণ গিয়ে ইট খুলে আনবে ক্যান্টনমেন্ট থেকে।
সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ এখন দাবি করছেন, প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই হাদিকে দূনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার ছক কষা হয়েছিল। তাই তাঁর খুনিরা ধরা পড়ছে না। তাঁরা দেশের বাইরে চলে গেলেও তা হয়েছে রাষ্ট্রীয় সাহায্যে। ওসমান হাদির দাদা যথার্যই বলেছেন, হাদিকে ভারত-বিরোধী প্রমান করে ভারতের দিকে তাঁকে খুনের অভিযোগ ঘুরিয়ে দেওয়া ছিল এই চক্রান্তেই অঙ্গ। দেখতে দেখতে বাংলাদেশে ভোট চলে আসবে, হাদিকে শহীদ প্রতিপন্ন করে রাজনীতি করে যাবে একদল ক্ষমতালোভী মানুষ। কিন্তু ইনসাফ থেকে যাবে অধরাই।












Discussion about this post