বাংলাদেশের ভোট যত এগিয়ে আসছে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে তদারকি সরকার প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হচ্ছে। অন্তত সাদা চোখে সেটাই ধরা পড়ছে। সেনাপ্রধান ওয়াকার জানিয়ে দিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট নির্বিঘ্নে করতে তিনি বদ্ধপরিকর। তিনি এই ব্যাপারে তাঁর বাহিনীকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্টে তিনি এবং বায়ুসেনা এবং নৌসেনা প্রধানদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এক লাখের ওপর সেনাবাহিনীর সদস্য, বিমান বাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ সদস্য নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হবে। এছাড়াও থাকবের্যাব, বিজিবি এবং সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। সভায় ছিলেন নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসানও। তিনি জানিয়েছেন, দিন-রাত অভিযান চলছে। গ্রেফতার করা হচ্ছে দুষ্কৃতীদের। আমাদের সবার উদ্দেশ্য একটা – সুষ্ঠু, সুন্দর এবং অবাধ নির্বাচন। প্রায় একই কথা শোনা গিয়েছে বায়ুসেনা প্রধান এয়ার চিফ মার্শালের গলাতেও। তিনিও তাঁর ইউনিটের সদস্যদের বার্তা দিয়েছেন। এয়ার চিফ মার্শাল জানিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে আমাদের। সে উদ্দেশে সাধারণ ভোটারদের মনে আস্থা জোগাতে হবে। যাঁরা মাঠে মোতায়েন থাকবেন তাঁদের সবার দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়াতে হবে।” এই সব কিছুকে যে প্রশ্নটা ছাপিয়ে যাচ্ছে, তা হল ১২ ফেব্রুয়ারি তিন বাহিনীর তিন প্রধান তাদের ইউনিট সদস্যদের যে নির্দেশ দিয়েছন, তারা সেই নির্দেশ কার্যকর করতে পারবে তো? তাদের আদৌ সেই কাজ করতে দেবেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার? বলা হচ্ছে মুহাম্মদ ইউনুস এবং সেনাপ্রধান ওয়াকারের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব না মিটলে নির্বাচনে এর বড়ো প্রভাব পড়তে পারে।
দুইয়ের এই দ্বন্দ্ব নিয়ে ভারতের গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ একটি খবর প্রকাশ করেছে। সেই খবরে বলা হয়েছে, ওয়াকার এবং ইউনূসের দ্বন্দ্বের মূল কারণ সিজিএস পদে নিয়োগ নিয়ে। গত ১৭ জানুয়ারি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান এলপিআর-য়ে চলে যান (লিভ প্রিপেরটরি টু রিটায়ারমেন্ট)। তার পর থেকে পদটি শূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে। আর মিজানুর বাধ্যতামূলক ছুটিতে চলে যাওয়ার পর থেকে ইউনূস এবং সেনাপ্রধানের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সূত্রের খবর, সিজিএস পদে ওয়াকার চাইছেন আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কম্যান্ড জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনুর রহমানকে। আর ইউনূস এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুরের পছন্দ ২৪ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং মেজার জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে।
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব সামলেছেন ১৭ জন। যার মধ্যে সাতজন সিজিএস থেকে পদোন্নতি পেয়ে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। মেজর জেনারেল মুশফিকুর বিএনপি-পন্থী। জেনারেল ওয়াকার ইউনূসের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নারাজ। জানুয়ারিতেই লেবাননে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল জুবায়ের সালেহীনকে এই পদে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি এলপিআর-য়ে চলে যাওয়ায় পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়।
সর্বশেষ সিজিএস জেনারেল সামিম এলপিআর-য়ে চলে যাওয়ার আগে এই পদে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানকে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। অন্যদিকে কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেলকে পিএসও পদে নিয়োগ করার চেষ্টা করেন তদারকি সরকার প্রধান। সেনাপ্রধান ওয়াকার এই দুই নিয়োগে প্রবল আপত্তি তোলেন। কারণ তিনি জানতেন, এই দুটি নিয়োগ মানে তাঁর ক্ষমতা ছাঁটাই করা। আর সেটা হলে বাহিনীর রাশ কার্যত মুহাম্মদ ইউনূসে হাতে চলে যাবে। নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭য়ের জুন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন সেনাপ্রধান। অর্থাৎ বিএনপি বা জামায়াত যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সেনাপ্রধানকে এই দুইয়ের মধ্যে কোনও একটি দলের সরকারের আওতায় তাকে কাজ করতে হবে। আগামী ১৬ মাস পাকিস্তানপন্থী কোনও অংশ শক্তিশালী না হয়ে উঠতে পারে, তা নিশ্চিত করতে চাইছেন সেনাপ্রধান ওয়াকার। আর ঠিক তার উল্টো কাজটা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে তদারকি সরকার প্রধান ইউনূস এবং তাঁর পারিষদবর্গ। ভোটের আগে এই দুইয়ের ইগোর লডা়ই কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটা যেমন দেখার বিষয়, দেখার বিষয় এটাও যে সেনাবাহিনী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে কি না ?












Discussion about this post