আগামীকাল, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে সেখানে ভোট হতে চলেছে। ভোট সকাল সাড়ে সাতটা থেকে। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে জুলাই সনদের ওপর গণভোট। বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭৬ লক্ষ ৯৫ হাজার ১৮৩ তাদের পরবর্তী সরকার বেছে নেবেন। রাতের দিকে স্পষ্ট হয়ে যাবে, কারা আগামী পাঁচবছর বাংলাদেশ শাসন করবে। ভোট নিয়ে সর্বশেষ একটি জনমত সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। সেই জনমত সমীক্ষার রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশ শাসন করবে বিএনপি। দ্বিতীয় স্থানে থাকতে চলেছে জামায়াত। এনসিপি, যাদের হাত ধরে বাংলাদেশে পালাবদলের সূচনা, তারা জনমানসে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। জনমত সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, তারা খুব বেশি হলে পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ভোট পেতে পারে। কোনও কোনও মহল থেকে আবার এটাও আশঙ্কা করা হচ্ছে যে শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বাতিলও হয়ে যেতে পারে। বিশেষ একটি গোষ্ঠী ভোট বানচাল করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে ভোটের ঠিক আগে সেনাবাহিনীর এক কর্তা যে বার্তাটি দিলেন সেটি ভয়ংকর। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচিত নেতারা আবার ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী আবার জনগণের পাশে দাঁড়াবে। ভারতীয় নিউজ ম্যাগাজিন দ্য উইককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর এই কথা বলেছেন। কে এই ফজলে এলাহি? তিনি বেগম জিয়ার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। আর ওয়াকারউজ্জামানের “বিশ্বস্ত সেনাপতি”।
কথা বলেছেন, ২৪-য়ের গণআন্দোলন নিয়েও। সাংবাদিক নম্রতা বিজি আহুজা তাঁর কাছে জানতে চান, ২০২৪-য়ের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সেই সংকটময় সময়ে সেনাপ্রধান আপনাকে ডেকেছিলেন। সেই মুহূর্ত এবং তারপর কী ঘটেছিল ?
জবাবে অবসরপ্রাপ্ত মেজর বলেন, “মধ্যরাতের কিছু পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আমাকে জানানো হয় পরদিন সকালে সেনাপ্রধান আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। সেই সময় দিনগুলি ছিল ভয়ংকর উত্তেজনাপূর্ণ। ঝুঁকির বিষয়টি সবাই বুঝেছিল। আমার সন্তানরা বিদেশে থাকে। পরিবার ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু আমার জন্য সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল। আমি একজন সেনাকর্মকর্তা। সেনাপ্রধান ডাকলে তাঁর সঙ্গে দেখা করাটা আমার কর্তব্য। সকাল ঠিক ১০টা নাগাদ আমি তাঁর বাসভবনে যাই। তিনি আগেই সেখানে ছিলেন। ” অবসরপ্রাপ্ত মেজর আরও বলেন বসার আগেই তিনি তিনটি বিষয় পরিষ্কার করে দেন। প্রথমত তিনি আর কোনও রক্তপাত চান না। দ্বিতীয়ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কোনও ইচ্ছে তাঁর নেই। তৃতীয় বিষয়টি হল এই সংকটের সমাধান হতে হবে প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সেনাপ্রধান মনে করেছিলেন পরিস্থিতি এমন একা জায়গায় পৌঁছেছে যে বিলম্ব হলে বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা শুরু হবে। তিনি আমাকে ডেকেছেন কারণ, তাঁর ধারণা ছিল রাজনৈতিক বিভাজনের উর্ধ্বে সমাজের বিভিন্ন অংশে আমি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব। তিনি আমাকে দ্রুততম সময়ে আলোচনা আয়োজন করার নির্দেশ দেন। আমি প্রত্যুত্তরে বলি, যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কথা শেষের দিকে। সময় তখন প্রায় সকাল ১০টা ২৫–তিনি আমাকে জানান, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভারতীয় সেনাপ্রধান তার সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি আমাকে থাকতে বলেন, কিন্তু আমি না করি। ভবিষ্যতে ভুল ব্যাখ্যা বা বিশ্বাসহানির কোনো সুযোগ রাখতে চাইনি। আমি সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে যাই।
হাসিনার দেশ থেকে চলে যাওয়ার বিষয়টি তিনি কীভাবে দেখছেন, এই প্রশ্ন করা হলে অবসরপ্রাপ্ত মেজর খুব কঠোর ভাষায় ব্যবহার করেছেন। ফজলে এলাহি আকবর বলেন, “এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন। বহু নাগরিক মনে করেন, তাকে হেফাজতে নিয়ে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা উচিত ছিল, বিশেষ করে বছরের পর বছর দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে। এই অনুভূতি বোঝা যায়। কিন্তু সংকট ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তাকে চলে যেতে দেওয়ায় ব্যাপক রক্তপাত এড়ানো গেছে।” সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “ খুব দ্রুত। ফোনকল, বিমানের গতিবিধি, ট্রান্সপন্ডারের অনুপস্থিতি–সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটি কেবল একতরফা বাংলাদেশি সিদ্ধান্ত ছিল না। শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে আমি মনে করি, ভারতও তাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। না হলে তার প্রাণনাশের বাস্তব আশঙ্কা ছিল। এতে কি প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের ওপর দায়িত্ব পড়ে? ”তিনি আরও বলেন, “ সব দিক থেকে জনতা এগিয়ে আসছিল। সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালাতে পারত না। একটি জাতীয় সেনাবাহিনী নিজের জনগণের ওপর গুলি চালাতে পারে না। সে সময় সহিংসতা বেড়ে গেলে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেনাবাহিনী অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ত। সে অর্থে, তার প্রস্থান দেশকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছে। ”
সাক্ষাৎকারে যে অংশের মধ্যে অশনি সংকতে রয়েছে, সেই বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে প্রশ্ন করা হয়, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? জবাবে অবসরপ্রাপ্ত মেজর বলেন, “শাসনব্যবস্থা–শুধু নির্বাচন জেতা নয়। বিচার বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা নাগরিককে অনিরাপদ করে তোলে এবং সংবিধানকে অর্থহীন করে দেয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মৌলিক। এটি আরেকটি ঐতিহাসিক সুযোগ। বাংলাদেশ অতীতে অনেক সুযোগ হারিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম অধৈর্য এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নির্বাচিত নেতারা আবার ব্যর্থ হলে, ইতিহাস বলে– আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটবে এবং সেনাবাহিনী আবারও জনগণের পাশে দাঁড়াবে।”












Discussion about this post