বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামাতের সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক হিসেব অনেকটাই উল্টো দিয়েছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল। হিসেব বদলে দিয়েছে তারেক রহমানের বিজয়। তারেক যে কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, সেই কেন্দ্রটি অভিজাত এলাকায়। তারেকের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন খলিদুজ্জামান। দুইয়ের মধ্যে ভোট ব্যবধান মাত্র চার হাজারের। ফলে, পরাজয় তাঁর কান ঘেঁসে বেরিয়ে গিয়েছে, তা সহজেই বলা যেতে পারে। নির্বাচনের আগে জামায়াতকে নিয়ে দেশি ও বিদেশি মহলে একটা হাইপ তৈরি করা হয়েছিল। ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে শুরু করে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের দিল্লি সফর – সবই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে এবার হয়তো ক্ষমতার দৃশ্যপটে বড়ো ধরনের কোনও পরিবর্তন আসছে। অনেকে বলছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিলেন। ফলপ্রকাশের পর দেখা গেল ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে আসীন হলেন তারেক রহমান। প্রশ্ন জাগে, তবে জামাতের কী সেই বিশাল সুযোগ শেষ হয়ে গেল? যুক্তরাষ্ট্র এবং তাঁদের মিত্ররা কি ভারতের কাছে হেরে গেল? আমেরিকার কোন গোপন চুক্তির বলি হল জামাত?
নির্বাচনের আগে জামাত এবং তাদের দলের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে একটা বার্তা দেওয়া হয়। বার্তাটি হল এবার তারা মসনদে বসছে। শুধু রাজপথ নয়, আন্তর্জাতিক লবিংয়েও তারা ছিল তুঙ্গে। ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতার জন্য ডিপ স্টেট জামাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুকের আচমকা দিল্লি সফর এবং জামাতের পক্ষে কথিত দূতিয়ালি করার খবরটি রাজনৈতিকমহলে চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামাত আমির স্বীকার করেছিলেন যে, দিল্লি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এই চতুর্মুখী তৎপরতা কীসের ইঙ্গিত ছিল? পশ্চিম বিশ্ব হয়তো মনে করেছিল, আওয়ামী লীগ বিহীন বাংলাদেশে জামাত সুশৃঙ্খল ক্যাডার ভিত্তিক দল হিসেবে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু এখানে হিসেবের একটা বড়ো গরমিল ছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিল্লির প্রভাব চিরকালই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। দিল্লি কখনই চাইবে না বাংলাদেশে কোনও উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় আসুক। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দিল্লির কাছে প্রথম পছন্দ ছিল বিএনপি। কারণ, জামায়াত ক্ষমতায় আসা মানে ভারতের সেভেন সিস্টার্সে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিল। বাংলাদেশের বাংলা রাষ্ট্র বা উগ্র ভাবাদর্শের উত্থান ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড়ো হুমকি। খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিতে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের অংশগ্রহণ এবং একই সময়ে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের শোকজ্ঞাপন তার একটা বিশেষ ইঙ্গিত দিয়েছিল। এটা ছিল সাউথব্লকে মারাত্মক কূটনৈতিক সিগন্যাল। জয়শঙ্করের মাধ্যমে তারেকের হাতে তুলে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী মোদির শোকবার্তা কম ইঙ্গিতবাহী নয়। বার্তা ছিল, ভারত বিএনপিকে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত। তাহলে কি দিল্লি এবং ওয়াংশিনটনের মধ্যে কোনও বোঝাপড়া হয়েছে? রাজনৈতিকমহলের একাংশ মনে করছে, গোপন সমঝোতা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে, আমেরিকা হয়তো দিল্লির প্রেসক্রিপশন মেনে নিয়েছে।
অনেকেই প্রশ্ন করছে যে জামাত এই বার যে সুযোগ জামাত পেয়েছে, ভবিষ্যতে তারা এই সুযোগ দ্বিতীয়বার পাবে? জামাত প্রচারে যে হাইপ তুলেছিল, ভোটে তার তেমন জোরালো প্রতিফলন ঘটেনি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ উগ্রপন্থা বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরিবর্তে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। তারা দেখেছে তদারকি সরকারের আমলে বাংলাদেশে কীভাবে ছড়িয়ে গিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ। যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং তাঁর মিত্ররা জামাতকে কোনও প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, রাজনীতি, সে জাতীয় রাজনীতি হতে পারে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি হতে পারে, চিরবন্ধু বলে কিছু হয় না। স্বার্থের প্রয়োজনে ডিপ স্টেট ইউনূসকে বসিয়েছিল। স্বার্থ পূরণ করতে না পারায়, তারা চেয়েছে পদ্মাপারে পালাবদল।












Discussion about this post