৩০০ আসনের মধ্যে ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি বা জাপা। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর পর এই জাতীয় পার্টিই সবচেয়ে বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। কিন্তু ফলাফল বলছে, একটি আসনেও জয়ের মুখ দেখেনি এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি। বলা হচ্ছে, এটা তাঁদের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়ে থাকলো। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর–৩ আসনে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। জি এম কাদের পেয়েছেন মাত্র ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট। আবার, জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা–১ আসনে নির্বাচনে লড়ে মাত্র ৩৪ হাজারের কাছাকাছি ভোট পেয়েছেন। তাঁর জামানতই জব্দ হয়ে গিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, কেন এই ভরাডুবি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে গিয়েছে জাতীয় পার্টি। ফলে তাঁরা স্বকীয়তা হারিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনেও জাপা ১১টি আসন পেয়েছিল। এবার তা শূন্যে নেমে এল। ফলে এই ভরাডুবির পিছনে রয়েছে কোনও না কোনও কারণ। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোট ও মিত্র দলগুলি এবার ভোটের ময়দান থেকে সরে এসেছিল। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাথায় তাঁরাও নির্বাচনে যায়নি। কিন্তু জাতীয় পার্টিই বিপুলসংখ্যক প্রার্থী দিয়ে ভোটের ময়দানে অবতীর্ণ হয়। জাপা নেতৃত্বের আশা ছিল, আওয়ামী লীগের ভোট তাঁদের বাক্সে আসবে, ফলে তাঁরা দারুণ ফল করবে। কিন্তু তা হয়নি।
অন্যদিকে দলের হেভিওয়েট নেতাদের অনেকেই ভোটের আগে আলাদা দল ঘোষণা করে আলাদা হয়ে যায়। যদিও তাঁরা প্রতীক জটিলতায় এবারের ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। ফলে জাতীয় পার্টি ভোটের আগেই ধাক্কা খেয়েছিল। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলে ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪ আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২২টি আসন পায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১১টি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দলটি আরেক দফা ভাঙনের মুখে পড়েই কার্যত ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল। আবার অনেকেই দাবি করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে তাঁরা কার্যত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। হু হু করে কমছিল দলটির সমর্থকের সংখ্যা। ফলে জাপা কার্যত নেতা সর্বস্ব দলে পরিণত হয়ে পড়ে।
অপরদিকে, দীর্ঘদিন ধরে রংপুরকে নিজেদের রাজনৈতিক ‘দুর্গ’ হিসেবে দাবি করে আসছে জাতীয় পার্টি। সাড়া দেশের মতো, সেখানেও মুখ থুবড়ে পড়লেন জাপার প্রার্থীরা। বলাই বাহুল্য তাঁদের শক্তঘাঁটি রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের একটিতেও জিততে পারেননি তাঁরা। এক সময় দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরে এই অঞ্চলে যে শক্ত ভিত গড়ে তুলেছিল জাপা, তা এবারের নির্বাচনে কার্যত তছনছ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দলটির প্রার্থীরা জামানত পর্যন্ত হারিয়েছেন। ফলে নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসতেই দলটির প্রতীক লাঙল সামনে রেথে জাতীয় পার্টির জানাজা বের করেন ব্যথিত সমর্থকরা। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যপক ভাইরাল হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু একটি পরাজয় নয়, বরং জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক অস্তিত্বই গভীর সংকটে পড়ে গেল।












Discussion about this post