ভোটের ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে ভারতের পূর্ব প্রান্তের প্রতিবেশী বাংলাদেশে। যে নির্বাচন নিয়ে বিগত কয়েকমাস ধরে টানাপোড়েন চলছিল, সেই নির্বাচন অবশেষে হয়েছে বাংলাদেশে। নির্বাচনের ফলও প্রত্যাশার অনেক ভালো। ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ আসঙ্কায় ছিলেন যে পদ্মাপাড়ের ভোটে কট্টরপন্থী জামায়াতে ইসলামী জোট ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। আর সেই চেষ্টা চলছিল বাংলাদেশের অন্তরবর্তী সরকার ও কয়েকটি বিদেশী রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু সে দেশের জনগণ তা নাকচ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, ভারতের গোপন কূটনৈতিক চালও এখানে কাজ করেছে। সবমিলিয়ে একটা গভীর ষড়যন্ত্র এড়িয়ে বাংলাদেশে এখন ধানের শীষে দোলা লেগেছে। অর্থাৎ বিএনপি এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সরকার গড়বে। প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। ভারত আশাবাদী, এবার তলানিতে চলে যাওয়া ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আবার উত্থান হতে চলেছে।
কিন্তু একটা কাঁটা অবশ্যই খচখচ করছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের মনে। তা হল বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক উত্থান। সে দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে পাকিস্তান পন্থী কট্টর এই মৌলবাদী সংগঠনটি রীতিমতো শিকড় গজিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্ষমতায় আসতে না পারলেও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে জিতে জামায়াতে ইসলামী এখন সে দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি। এখানেই শেষ নয় মূল চিন্তার বিষয় তাদের জয়ী আসনগুলির অবস্থান। দেখা যাচ্ছে একেবারে পশ্চিমবঙ্গের ওপারে থাকা বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া আসনগুলি জিতেছে জামায়াত ও তাঁদের সহযোগী দলগুলি। যদিও এই সীমান্তবর্তী এলাকা গুলিতে পাকিস্তানের আইএসআই ও কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের প্রচারকরা বিগত কয়েক মাস ধরে তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে গিয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল এই সমস্ত এলাকায় পাকিস্তানের জৈস-এ-মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তৈবার মতো জঙ্গি সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষ নেতা দীর্ঘদিন ধরে ঘাঁটি গেড়ে ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের হাতে তুলেও দিয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাতে খুব একটা আমল দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী লাগোয়া বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মৌলবাদীদের এই উত্থান ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা গুলিকে এবার চিন্তায় রাখবে, এ কথা বলাই বাহুল্য। আসুন এক নজরে একটু চোখ বুলিয়ে দেখে নেওয়া যাক।
পশ্চিমবঙ্গের দু’পাশেই ‘কট্টর মৌলবাদী শক্তি’ মাথাচাড়া দিচ্ছে। এই রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহীর মত এলাকায় জামাত একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়ে বিপুল আসন জিতেছে। আবার তাঁদের জোটসঙ্গীরাও ভালো ফল করেছে। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের কিষণগঞ্জ, কাটিহারের মতো জেলাগুলিতে রমরমা আসাদুদ্দিন ওয়েইসির দল মিমের। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদীয়া ও উত্তর ২৪ পরগনায় হু হু করে পরিবর্তন হচ্ছে ডেমোগ্রাফি। যা নিয়ে চিন্তায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বিজেপির দাবি, পশ্চিমবঙ্গের এক পাশে জামাতের এই উত্থান এবং অন্য পাশে মিমের রমরমা যথেষ্টই ‘উদ্বেগজনক’। বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এজেন্সিরও এ রাজ্যে সক্রিয়তা বাড়ানো দরকার। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান ভূকৌশলগত ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল’’।
অপরদিকে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বক্তব্য, এই সীমান্তবর্তী এলাকাগুলি নিয়ে এখন নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে ভারতের গুপ্তচর সংস্থা “র” এবং “আইবি”-কে। বিশেষ করে ইউনূস জমানায় বাংলাদেশের এই সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিই জঙ্গি কার্যকলাপ, জিহাদি প্রচারকদের আনাগোনা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছিল। তেমনই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি এবং পাক সামরিক কর্তাদের ঘনঘন বাংলাদেশ সফর অনেক না বলা কথা সামনে আনছিল। বিশ্লেষকদের দাবি, এতদিন ইউনূস সরকার বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবিধা নিয়ে ভারতবিরোধী কট্টরপন্থী শক্তিগুলো ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় তাঁদের সংগঠন মজবুত করেছে। এবার বিএনপির সরকার ক্ষমতায় এলে তাঁরা সীমান্ত এলাকায় নানা ভারতবিরোধী কাজের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে খারাপ করার প্রচেষ্টা চালাতে পারে। এটাও মাথায় রাখতে হচ্ছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে। এখন দেখার তারেক রহমানের সরকার, এ বিষয়ে কতটা উদ্যোগী হয়।












Discussion about this post